আজকাল ওয়েবডেস্ক: বেঙ্গালুরুর কোঠানুর এলাকাটি এমনিতে বেশ শান্ত, গাছপালায় ঘেরা এক মনোরম পরিবেশ। ৩০শে মার্চের সকালটাও আর পাঁচটা সাধারণ সোমবারের মতোই শুরু হয়েছিল। আবাসনগুলোতে তখন সবে ঘুমের ঘোর কাটছে, দৈনন্দিন ছন্দে ফিরছে চারপাশ। কিন্তু সেই আপাত শান্ত সকালের আড়ালে যে এক মর্মান্তিক ঘটনা দানা বাঁধছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি প্রতিবেশীরা। একটি ফ্ল্যাটের ভেতরে তখন শেষ হয়ে গিয়েছিল একটি প্রাণ, আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে গেল আরও একটি জীবন।
ভানু চন্দর রেড্ডি নামে এক তরুণ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে তার নিজের ফ্ল্যাটেই ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। নয় বছরের দাম্পত্য সঙ্গী শাজিয়ার চোখে প্রথম পড়ে স্বামীর নিথর দেহ। পুলিশকে খবর দেওয়ার পর এক মুহূর্ত আর স্থির থাকতে পারেননি শোকাতুর শারিয়া। বিকেলের রোদে যখন শহর ব্যস্ত হতে শুরু করেছে, তখনই আবাসনের ১৭ তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবনও শেষ করে দেন তিনি। এই যুগলের গল্পটা আসলে একরাশ স্বপ্নভঙ্গ, ভেঙে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক আর গভীর মানসিক যন্ত্রণার এক বিষাদময় দলিল।
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে ভানুর এক উজ্জ্বল কেরিয়ারের কথা। আমেরিকায় বার্ষিক প্রায় এক কোটি টাকার প্যাকেজে কাজ করতেন এই তরুণ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দাপটে সংস্থা যখন কর্মী ছাঁটাইয়ের পথে হাঁটে, তখন চাকরি হারান ভানু। দীর্ঘ এক বছর ধরে একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়েও কোথাও স্থায়ী সুযোগ পাননি তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলের অভিবাসন নীতি আর কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। আমেরিকা ছেড়ে কানাডায় গিয়েও ভাগ্য ফেরাতে পারেননি ভানু। শেষমেশ ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসেন দেশে।
এদিকে শারিয়া হায়দ্রাবাদের নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ভানুর সাথে বেঙ্গালুরুতে নতুন করে সংসার সাজাতে শুরু করেন। তিনি আইবিএমে যোগ দেন এবং দুজনে মিলে চেষ্টা করেন জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হলেও ভানু ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি অবসাদের জন্য নিয়মিত ওষুধ খেতেন বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের অনুমান, দীর্ঘ বেকারত্ব আর কেরিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তাই তাঁকে এই চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তবে এই বিষাদের মূলে কেবল পেশাদারি ব্যর্থতা ছিল না, ছিল এক গভীর পারিবারিক দূরত্ব। শৈশবের প্রেম থেকে দীর্ঘ লিভ-ইন রিলেশনশিপ, এরপর বিয়ে—সবই ছিল ঠিকঠাক। কিন্তু কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভিন্ন ধর্ম। ভানু যখন তাঁর পরিবারকে এই বিয়ের কথা জানান, মা তাঁর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। মা-ছেলের এই বিচ্ছেদ ভানুকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। অন্যদিকে শারিয়াও তাঁর প্রভাবশালী বাবার কাছে বিয়ের কথা গোপন রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। ঈদে বাড়ি গেলেও পরিবারের কেউ টেরই পায়নি যে তাঁদের মেয়ে কলকাতায় বা বেঙ্গালুরুতে এক গোপন জীবনের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।
ঘটনার দিন সকালে স্বামীর দেহ দেখে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন শারিয়া। আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঠিক আগে তিনি মাকে দুবার ফোন করেছিলেন, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনও সাড়া মেলেনি। মরিয়া হয়ে তিনি মেসেজে লিখেছিলেন, "আমায় ক্ষমা কোরো, আমি বিয়ে করেছি। তোমাদের কাছে মিথ্যে বলেছি। দয়া করে আমায় ক্ষমা করে দিও।" কিন্তু মর্মান্তিক বিষয় হলো, শাজিয়ার মা খুব একটা শিক্ষিত না হওয়ায় ওই বার্তার গভীরতা বুঝতে পারেননি, ফলে কোনও সতর্কতাও দেওয়া সম্ভব হয়নি।
পুলিশের উদ্ধার করা সুইসাইড নোটে ভানু আক্ষেপ করে লিখে গিয়েছেন যে তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি সুবিচার করতে পারেননি এবং মা-বাবার কাছে তাঁর পরিচয়টাও গর্বের সাথে তুলে ধরতে পারেননি। দিনশেষে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় দুই পরিবারের উপস্থিতিতে একই অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁদের শেষ বিদায় জানানো হয়। প্রথমে পরিবারগুলো কিছুটা আপত্তি করলেও এক আত্মীয়ের কথায় শান্ত হন সবাই। সেই আত্মীয় বলেছিলেন, "বেঁচে থাকতে তো ওরা একসাথে থাকার অধিকার পেল না, অন্তত বিদায়বেলায় ওদের একসাথেই যেতে দিন।"
















