আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের পরিস্থিতি বিষয়ক উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান পেশ করল কেন্দ্র। মোদি সরকার জানিয়েছে যে, গত পাঁচ বছরে বিদেশি মাটিতে প্রতিদিন গড়ে ২০ জনেরও বেশি ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন; আর এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর অধিকাংশই ঘটেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে।
গত ২৯ জানুয়ারি রাজ্যসভায় এক লিখিত জবাবে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং যে তথ্য উপস্থাপন করেছেন, সেই অনুযায়ী - ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিদেশে কর্মরত মোট ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৭,৭৪০-এ। তবে এই মৃত্যুগুলোর সুনির্দিষ্ট কারণ বা বিস্তারিত বিবরণ ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার ২০২১ সালে। সেই বছর বিদেশে ৮,২৩৪ জন ভারতীয় শ্রমিক প্রাণ হারান। ২০২২ সালে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমে ৬,৬১৪-তে নেমে এসেছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে হতাহতের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে! ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭,২৯১-এ, ২০২৪ সালে ৭,৭৪৭ এবং ২০২৫ সালে ৭,৮৫৪-তে।
বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের মোট মৃত্যুর ঘটনার ৮৬ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে উপসাগরীয় দেশগুলোতে। উল্লিখিত পাঁচ বছরের সময়কালে সংযুক্ত আরব আমিরশাহিএবং সৌদি আরবে হতাহতের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক, যথাক্রমে- ১২,৩৮০ এবং ১১,৭৫৭ জন। এরপরই রয়েছে কুয়েত (৩,৮৯০), ওমান (২,৮২১), মালয়েশিয়া (১,৯১৫) এবং কাতার (১,৭৬০)।
এই সময়ের মধ্যে, বিদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস বা মিশনগুলোতে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে হয়রানি, শোষণ এবং কর্মক্ষেত্র-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের মোট ৮০,৯৮৫টি আবেদন জমা পড়েঠে। এই অভিযোগগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক অভিযোগ এসেছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আরব আমিরশাহিতে মোট ১৬,৯৬৫টি অভিযোগ নথিবদ্ধ করা হয়। এরপরই রয়েছে কুয়েত (১৫,২৩৪), ওমান (১৩,২৯৫) এবং সৌদি আরব (১২,৯৮৮)।
২০১৮ সালে সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এই পরিসংখ্যান, কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ (CHRI)-এর তুলে ধরা তথ্য জানার অধিকার (RTI)-এর জবাব এবং সংসদীয় নথিপত্রের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
CHRI-এর ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওই সাড়ে ছয় বছরের সময়কালে উপসাগরীয় অঞ্চলের ছ'টি দেশে (বাহরিন, ওমান, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি) অন্তত ২৪,৫৭০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
এর তুলনায়, সরকারের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায় যে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে (বাহরিনন বাদে - কারণ প্রাপ্ত জবাবে দেশটির পরিসংখ্যান অনুপস্থিত ছিল) মোট ৩২,৬০৮ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এর অর্থ হল, গত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র উপসাগরীয় অঞ্চলেই প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে, মালয়েশিয়া এবং মালদ্বীপ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রম-সংক্রান্ত সমস্যার খবর পাওয়া গিয়েছে। দেশ দু'টিতে যথাক্রমে ৮,৩৩৩ এবং ২,৯৮১টি অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোতে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ঘটলেও, সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অভিযোগ এসেছে - বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এসব অভিযোগের সংখ্যা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত পাঁচ বছরে মায়ানমারে কোনও শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত না হলেও, সেখান থেকে ২,৫৪৮টি অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে - যার মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই অভিযোগের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে ১,৮৬৩-তে পৌঁছেছিল। কম্বোডিয়া থেকে ২,৫৩১টি অভিযোগের বিপরীতে ৩১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে, অন্যদিকে লাওসে ২,৪১৬টি অভিযোগের পাশাপাশি ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
গত পাঁচ বছরে শ্রম-সংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১৬,২৬৩টি, যা বেড়ে ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ ২২,৪৭৯-এ পৌঁছেছে। এই সংখ্যাটি ২০২১ সালে নথিভুক্ত ১১,৬৩২টি অভিযোগের প্রায় দ্বিগুণ।
মন্ত্রকের দেওয়া তথ্যানুসারে, বিদেশে কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, তার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলো হল বেতন এবং চাকরির মেয়াদ শেষে প্রাপ্য সুবিধাদি পেতে বিলম্ব হওয়া কিংবা তা একেবারেই না পাওয়া।
অন্যান্য সাধারণ অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নিয়োগকর্তাদের দ্বারা বেআইনিভাবে পাসপোর্ট আটকে রাখা, ছুটি না দেওয়া, অতিরিক্ত কাজের সময়ের জন্য বাড়তি পারিশ্রমিক (ওভারটাইম) না দেওয়া এবং হঠাৎ করে কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বেকার হয়ে পড়া। মন্ত্রক এমন সব ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছে যেখানে শ্রমিকদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, তাদের বৈধ শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ভারতে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় 'এক্সিট ভিসা' দিতে নিয়োগকর্তারা অস্বীকার করেছেন।
এই সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বিস্তারিত তুলে ধরে বিদেশ প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং বলেন, "বিদেশে অবস্থানরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা সরকারের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। বিদেশে কোনও ভারতীয় নাগরিকের বিপদে পড়ার খবর পাওয়া মাত্রই, সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশন ও কার্যালয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট সেই দেশের বিদেশ মন্ত্রক, শ্রম বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে।"
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, কূটনৈতিক সহায়তা ও আইনি সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি, ভারতীয় শ্রমিকদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে ভারত সরকার বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে শ্রম ও জনশক্তি সহযোগিতার বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে।
















