আজকাল ওয়েবডেস্ক: মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষার বিতর্ক ও পেপার ফাঁসের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার জাতীয় স্তরের আরও এক বড় পরীক্ষা নিয়ে চরম মুখ পুড়ল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা নির্ণায়ক পরীক্ষা ইউজিসি নেট (UGC NET)-এর প্রশ্নপত্রের মান, অসঙ্গতি এবং প্রশ্ন ‘টুকলি’ করার গুরুতর অভিযোগ তুলে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দেশের হাজার হাজার গবেষক ও পরীক্ষার্থী। ইংরেজি, সমাজবিদ্যা (সোসিওলজি) এবং মনোবিদ্যা (সাইকোলজি) সহ একাধিক বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে তৈরি হওয়া এই নজিরবিহীন বিতর্ক এখন দেশের উচ্চশিক্ষা মহলে অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের ইংরেজি পরীক্ষার মোট ১৫০টি প্রশ্নের মধ্যে অন্তত ৬৭টি প্রশ্নই হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে ২০২৪ সালের পরীক্ষা থেকে। শুধু প্রশ্ন দেওয়াই নয়, উত্তরের বিকল্পগুলোর ক্রমবিন্যাস পর্যন্ত হুবহু এক রেখে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবিদদের একাংশের দাবি, জাতীয় স্তরের একটি সম্মানজনক পরীক্ষায় মাত্র দুই বছর আগের প্রশ্নপত্র থেকে এভাবে গণহারে প্রশ্ন তুলে দেওয়া কেবল চরম খামখেয়ালিপনা নয়, বরং এক ধরনের ‘অ্যাকাডেমিক অসততা’। এর ফলে যারা মূল বিষয় না বুঝে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের পুরোনো প্রশ্নপত্র মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়েছেন, তারা অন্যায্য সুবিধা পাবেন, যা সৎ ও পরিশ্রমী পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। অনেকের মোটেই এই ঘটনা নিছকই কোনও বিচ্ছন্ন 'ভুল' নয় বরং নেট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা প্রাইভেট কোচিং কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে এক গোপন আঁতাত বলেই মনে করছেন পরীক্ষার্থীরা।

ইংরেজি যদি প্রশ্ন চুরির অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়ায়, তবে সমাজবিদ্যার প্রশ্নপত্র বিদ্ধ হয়েছে চরম অপেশাদারিত্ব ও গাফিলতির কারণে। পরীক্ষা দিয়ে আসার পর বহু ছাত্রছাত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নপত্রের স্ক্রিনশট শেয়ার করে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, গোটা প্রশ্নপত্র জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য বানান ভুল ও ব্যাকরণগত ত্রুটি। এমনকি সমাজবিজ্ঞানের প্রবাদপ্রতিম পণ্ডিতদের নাম পর্যন্ত ওলটপালট করে ছাপা হয়েছে। যেমন, জর্জ রিটজারের নাম হয়ে গেছে ‘পুটজার’, ট্যালকট পার্সনস হয়ে গেছেন ‘পারসো’, জি এস ঘুর্যে হয়েছেন ‘ঘুন্যে’ এবং এ আর দেশাইয়ের নাম বদলে লেখা হয়েছে ‘এ কে দেশাই’। শুধু তাই নয়, প্রশ্নপত্রের হিন্দি অনুবাদ এতটাই নিম্নমানের ছিল যে, তার আসল অর্থ উদ্ধার করতেই পরীক্ষার্থীদের কালঘাম ছুটেছে। পাঠ্যক্রমের বাইরে থেকেও বহু অবান্তর প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

একই অভিজ্ঞতা হয়েছে মনোবিদ্যা বা সাইকোলজির, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরীক্ষার্থীদেরও। তাঁদের দাবি, বিগত ৫-৭ বছর ধরে এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পরও পরীক্ষার হলে বসে মনে হচ্ছিল তাঁরা যেন সম্পূর্ণ কোনও অচেনা বিষয়ের পরীক্ষা দিচ্ছেন। সিলেবাসের সাথে কোনও  সম্পর্ক নেই এমন আজব এবং অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন দিয়ে খাতা ভরানো হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের 'কম্প্রিহেনশন' ইউনিট থেকে অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করা হয় যার সঙ্গে মূল কম্প্রিহেনশনের কোনও সম্পর্কই নেই।  জুনের তীব্র দাবদাহের মধ্যে বহু পরীক্ষাকেন্দ্রে এসি তো দূরস্ত, ন্যূনতম আলো-বাতাসের ব্যবস্থাটুকুও ছিল না বলে পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছেন। নেট পরীক্ষা শুধুমাত্র একটা সাধারণ পরীক্ষা নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে পিএইচডির ভবিষ্যৎ, ফেলোশিপ এবং সরকারি চাকরির স্বপ্ন। ফলে এনটিএ-র এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে দেশের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হয়ে গেছে।