আজকাল ওয়েবডেস্ক: শুক্রবার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) জানিয়েছে, হরিয়ানা ভিত্তিক আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি ও ভবন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি টাকা, অ্যাটাচ করা হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর দিল্লির লালকেল্লা এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনার পর নিরাপত্তা সংস্থার নজরে আসে এই বিশ্ববিদ্যালয়। একই সঙ্গে আল ফালাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান জাওয়াদ আহমেদ সিদ্দিকি ও তাঁর পরিচালিত আল ফালাহ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দাখিল করেছে ইডি।
ইডি সূত্রে জানা গেছে, গত নভেম্বরেই জাওয়াদ আহমেদ সিদ্দিকিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ, তাঁর ট্রাস্ট পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ুয়াদের সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অর্থ তছরুপ ও সেই অর্থ সাদা করার চেষ্টা করা হয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০২-এর আওতায় এই তদন্ত চলছে।
ইডির অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে নিয়মিতভাবে ভুয়ো রোগী দেখিয়ে সরকারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল (NAAC) এবং ইউজিসি-র স্বীকৃতি পেতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়। হাসপাতালের পরিকাঠামো ও রোগী পরিষেবার ভুয়ো চিত্র তুলে ধরতেই এই ‘ফেক পেশেন্ট’ ব্যবস্থা চালু ছিল বলে দাবি তদন্তকারী সংস্থার।
ইডির দাবি, এই ভুয়ো রোগীদের বিশেষভাবে নিয়োগ করা হতো পরিদর্শনের সময় রোগীর উপস্থিতির ভান তৈরি করার জন্য। স্থানীয় আশা কর্মীদের সহযোগিতায় এই কাজ চলত বলে অভিযোগ। আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি বিভাগের এক আধিকারিক ফারদিন বেগের বয়ান উদ্ধৃত করে ইডি জানিয়েছে, তিনি স্বীকার করেছেন যে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য নিয়মিতভাবে ‘ফেক পেশেন্ট’ আনা হতো।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, এই ভুয়ো রোগীদের নাম, উপস্থিতি ও অর্থপ্রদানের বিস্তারিত নথি সংরক্ষণ করতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ আধিকারিক কামরান আলম। এই সমস্ত নথি চেয়ারম্যান জাওয়াদ আহমেদ সিদ্দিকির অনুমোদন সাপেক্ষেই চূড়ান্ত হতো। নিয়মিত ভাউচারের মাধ্যমে নগদ টাকা মেটানো হত ভুয়ো রোগীদের, এমন দাবিও করা হয়েছে।
ইডির নথিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভূপিন্দর কৌর আনন্দের বয়ানও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেসব চিকিৎসকের নাম পরে সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে উঠে এসেছে, ডা. মুজাম্মিল, ডা. শাহিন এবং ডা. উমর উন নবি, তাঁদের নিয়োগ তাঁর কার্যকালের মধ্যেই হয়েছিল। কৌর জানিয়েছেন, এই সমস্ত নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতেন চেয়ারম্যান জাওয়াদ আহমেদ সিদ্দিকি।
তদন্তকারী সংস্থার আরও দাবি, এই নিয়োগগুলির ক্ষেত্রে কোনও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা নিরাপত্তা যাচাই করা হয়নি। বিশেষ করে ডা. উমর উন নবি, যিনি লালকেল্লা বিস্ফোরণ মামলার মূল অভিযুক্ত, তাঁর নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ডা. জামিল খানের সুপারিশে শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যানের অনুমোদনেই তা কার্যকর হয়।
ইডি জানিয়েছে, আল ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের ওয়েবসাইটে তথ্য সংশোধন ও আপডেটের কাজ একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে করা হতো। এই পরিবর্তনগুলি করা হয় চেয়ারম্যানের নির্দেশে, বিশেষ করে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর NAAC-এর শোকজ নোটিশের পর। অভিযোগ, ইউজিসি ১২বি স্বীকৃতি ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড সংক্রান্ত ভুয়ো বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বা গোপন করা হয়।
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শিক্ষক ও চিকিৎসক নিয়োগ ঘিরে। ইডির দাবি, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশনের (NMC) নিয়ম পূরণের জন্য বহু চিকিৎসককে কেবল ‘কাগজে-কলমে’ নিয়োগ করা হয়েছিল। বাস্তবে তাঁরা নিয়মিত কলেজে আসতেন না, ক্লাস নিতেন না বা হাসপাতালে রোগী দেখতেন না। কিন্তু পরিদর্শনের সময় তাঁদের পূর্ণ সময়ের কর্মী হিসেবে দেখানো হতো।
ইডির অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ৬০ জনের বেশি চিকিৎসক এবং এমনকি উপাচার্য ভূপিন্দর কৌর আনন্দ নিজেও এই ‘অন-পেপার’ তালিকায় ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ ফিনান্সিয়াল অফিসার মহম্মদ রাজি এবং উপাচার্য, দু’জনেই ইডির কাছে দেওয়া ধারা ৫০-এর জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন যে এই ‘অন-পেপার ডাক্তার’ প্রথা ছিল শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শন পাশ করার জন্য।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, জাল চিকিৎসক নিয়োগ সংক্রান্ত নথি ব্যবহার করে হরিয়ানা সরকারের কাছ থেকে এসেনশিয়ালিটি সার্টিফিকেট আদায় করা হয়। এই সার্টিফিকেটই পরে NMC-এর কাছে স্নাতকোত্তর (পিজি) কোর্সের অনুমোদন পেতে ব্যবহার করা হয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই মামলায় ইডির তদন্ত সীমাবদ্ধ আর্থিক অনিয়ম ও মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অভিযোগে। দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণ সংক্রান্ত সন্ত্রাসবাদী দিকটি খতিয়ে দেখছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। তবে ইডির দাবি, আর্থিক দুর্নীতি, ভুয়ো নিয়োগ ও প্রশাসনিক অনিয়মের জাল এই দুই তদন্তকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করাচ্ছে।
