আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেন্দ্রীয় সরকার তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ধারা ৬৯এ ব্যবহার করে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ব্লক করার নির্দেশ দিয়েছে। এই পোস্টগুলির বেশিরভাগই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তাঁর নীতি, রাজনৈতিক আচরণ বা বিদেশনীতি নিয়ে ব্যঙ্গ, সমালোচনা বা কটাক্ষ করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন ব্যবহারকারী এবং বিশ্লেষকের মতে, গত কয়েক সপ্তাহে এই ধরনের ব্লকিংয়ের ঘটনা হঠাৎ করে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।

এই সেন্সরশিপের বিষয়টি সামনে আসছে মূলত ব্যবহারকারীদের প্রকাশ করা নোটিশের মাধ্যমে। কারণ তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এই ধরনের ব্লকিং নির্দেশ কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে জারি করে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স ব্যবহারকারীদের জানায় যে তাদের পোস্ট ভারতে ব্লক করা হয়েছে, কিন্তু কেন বা কোন সরকারি সংস্থা সেই নির্দেশ দিয়েছে তা বিস্তারিতভাবে জানানো হয় না। ব্যবহারকারীরা চাইলে সরকারের কাছে আপত্তি জানাতে পারে বলে নোটিশে উল্লেখ থাকে।

সরকারি নির্দেশের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশিত না হওয়ায় এই সেন্সরশিপের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে Meta-র প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে সরকারী নির্দেশে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম থেকে মুছে ফেলা কনটেন্টের সংখ্যা ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের সংগৃহীত তালিকা থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে গত এক মাসে ব্লকিংয়ের ঘটনা আরও দ্রুত বেড়েছে।

১০ মার্চ ২০২৬-এ রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট সতীশ আচার্য জানান যে তাঁর দুটি কার্টুন এক্স প্ল্যাটফর্মে ভারতে ব্লক করা হয়েছে। প্রথম কার্টুনটির শিরোনাম ছিল “India-Iran dosti is as old as history!”, যেখানে চোখ বাঁধা অবস্থায় মোদিকে একটি মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মৃতদেহটির উপর লেখা ছিল “Killed by USA & Israel”। দ্বিতীয় কার্টুনে আমেরিকার পতাকার নকশা করা টুপি পরা একটি চরিত্রকে দেখানো হয়, যার সঙ্গে যুক্ত ক্যাপশনে দাবি করা হয় যে ভারতের সঙ্গে নৌ-মহড়ায় অংশ নেওয়ার পর ফেরার পথে একটি ইরানি জাহাজ মার্কিন সাবমেরিনের আক্রমণে ধ্বংস হয়েছে। আচার্য এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন যে কোনও সরকার যখন জোর করে কোনও কার্টুন বন্ধ করার চেষ্টা করে, তখন সেই কার্টুন সাধারণত আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

এছাড়া ব্যঙ্গাত্মক মিম, ভিডিও, রাজনৈতিক মন্তব্য এবং বিরোধী নেতাদের বক্তব্য শেয়ার করা একাধিক পোস্টও ব্লক করা হয়েছে। সাংবাদিক সুশান্ত সিং, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং ‘Amockx2022’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট এমন পোস্টের জন্য নোটিশ পেয়েছে যেখানে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্য শেয়ার করা হয়েছিল। সেই বক্তব্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির নাম উল্লেখ করে প্রয়াত মার্কিন অর্থ সাহায্যকারী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। একই ধরনের অভিযোগ বা মন্তব্য থাকা আরও কয়েকটি পোস্টও ব্লক করা হয়েছে।

ভারতের বিদেশনীতি নিয়েও কিছু পোস্ট ব্লক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে একটি ইরানি জাহাজ ধ্বংস হওয়ার পর ভারত সরকারের নীরবতা নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্টগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। একটি পোস্টে ২০১৬ সালে মোদির করা একটি টুইট তুলে ধরে বলা হয়েছিল যে তিনি একসময় বলেছিলেন সরকারকে সমালোচনা করা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। সেই পোস্টটিও ব্লক করা হয়েছে। অন্য একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল যে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত থামাতে বা কিছু আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে ভারত মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। সেটিও ভারতে দেখা যাচ্ছে না।

কিছু ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টও ব্লক হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে একটি ভিডিও থাম্বনেইল যেখানে একটি বলিউড অভিনেতার হাসির ছবি ব্যবহার করে ভারতের বর্তমান বিদেশনীতি নিয়ে কৌতুক করা হয়েছিল। আরেকটি পোস্টে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় মোদির হাসির ভঙ্গিকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। এমনকি হটমেইলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাবির ভাটিয়ার করা একটি পোস্টও ব্লক করা হয়েছে, যেখানে মোদির একটি সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণের ভুল নিয়ে আলোচনা ছিল।

সংবাদমাধ্যম দ্যা ওয়্যার-এর বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের দুটি ব্যঙ্গাত্মক মিউজিক ভিডিওও ভারতে ব্লক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে কংগ্রেস মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রিনাতে অভিযোগ করেছেন যে দলের তৈরি নয়টি এআই-নির্মিত ব্যঙ্গচিত্র—যেগুলি আইটি নিয়ম অনুযায়ী স্পষ্টভাবে লেবেল করা ছিল—সেগুলিও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনার সমালোচনা করে ইন্টারনেট নীতি বিশেষজ্ঞ এবং Centre for Internet and Society-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রণেশ প্রকাশ বলেন যে এই ধরনের ব্লকিং কার্যত “অদৃশ্য সেন্সরশিপ”-এর উদাহরণ। তাঁর মতে, ব্যবহারকারীদের আগে থেকে নিজেদের বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয় না এবং ব্লকিংয়ের কারণ বা আইনি ভিত্তিও প্রকাশ করা হয় না। তিনি উল্লেখ করেন যে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে সরকার কোনও কনটেন্ট ব্লক করতে পারে যদি তা “প্রয়োজনীয় বা সুবিধাজনক” বলে মনে হয়। কিন্তু “expedient” বা সুবিধাজনক হওয়া “necessity” বা প্রয়োজনীয়তার তুলনায় অনেক দুর্বল মানদণ্ড।

২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট শ্রেয়া সিঙ্ঘল মামলায় ধারা ৬৯এ-এর সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রাখলেও বলেছিল যে ব্লকিংয়ের ক্ষেত্রে লিখিত কারণ থাকতে হবে যাতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি নিয়মের ২০০৯ সালের রুল ১৬ অনুযায়ী এই ধরনের সরকারি নির্দেশ কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে রাখতে হয়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা জানতেই পারেন না কেন তাদের পোস্ট ব্লক করা হয়েছে বা কীভাবে আইনি প্রতিকার চাইতে হবে।

একই সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির উপর চাপও বেড়েছে। আইটি আইনের ধারা ৭৯ অনুযায়ী, ব্যবহারকারীর পোস্টের জন্য আইনি দায় থেকে মুক্তি পেতে হলে কোম্পানিগুলিকে দ্রুত সরকারী নির্দেশ মানতে হয়। সাম্প্রতিক নিয়মে এই সময়সীমা আরও কমিয়ে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলির পক্ষে পোস্টের বৈধতা যাচাই করা সম্ভব হয় না এবং তারা দ্রুত কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়।

সমালোচকদের মতে, ব্যঙ্গচিত্র, মিম বা রাজনৈতিক সমালোচনা—যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রকাশ—সেগুলিই যদি ধারাবাহিকভাবে ব্লক করা হয়, তবে তা ভারতের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দেয়।