আজকাল ওয়েবডেস্ক: কেন্দ্র সরকার পরিচালিত আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয়গুলিতে (একলব্য মডেল রেসিডেনশিয়াল স্কুল- ইএমআরএস) বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সংসদ ও বিধায়কদের  আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে ন্যাশনাল এডুকেশন সোসাইটি ফর ট্রাইবাল স্টুডেন্টস (NESTS), যা কেন্দ্রীয় জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রকের অধীন একটি সংস্থা এবং সারা দেশে ইএমআরএসগুলির তত্ত্বাবধান করে। দ্য টেলিগ্রাফ এই খবর প্রকাশ করেছে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, ইএমআরএস বিদ্যালয়গুলিতে নিয়মিতভাবে নানা গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, যেমন বার্ষিক উৎসব, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, রাজ্যস্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক সমাবেশ। এই সব অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও ঊর্ধ্বতন জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের “গুরুত্ব বৃদ্ধি করে” এবং শিক্ষার্থীদের কাছে তা “অনুপ্রেরণার উৎস” হিসেবে কাজ করে বলে দাবি করেছে নেস্টস।

সার্কুলারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “মাননীয় সংসদ, বিধায়ক, জেলা শাসক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক আধিকারিকদের মতো সিনিয়র জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এই ধরনের অনুষ্ঠানের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাঁদের উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে এবং বিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক দৃঢ় করে।” সেই কারণে দেশের সমস্ত ইএমআরএস বিদ্যালয়কে বড় অনুষ্ঠানগুলিতে এমপি, এমএলএ, জেলা শাসক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের আমন্ত্রণ জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কেন্দ্র সরকারেরই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা-নীতিগত নথিগুলির সঙ্গে এই নির্দেশের স্পষ্ট বিরোধ দেখা যাচ্ছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০–এর ভিত্তিতে এনসিইআরটি প্রণীত জাতীয় স্কুল শিক্ষা পাঠ্যক্রম কাঠামো (ন্যাশনাল কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক ফর স্কুল এডুকেশন- এনসিএফএসই) বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিদের আমন্ত্রণের কথা কোথাও উল্লেখ করেনি। বরং এই নথিতে বিদ্যালয়ের কার্যকলাপে অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এনসিএফএসই-তে বলা হয়েছে, “বিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবে অভিভাবকদের আমন্ত্রণ জানানো আবশ্যক। শুধু দর্শক হিসেবে নয়, তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো করে এই অনুষ্ঠানগুলির নকশা তৈরি করা উচিত।” অর্থাৎ, বিদ্যালয়কে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নয়, বরং অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণকেই শিক্ষানীতির দিকনির্দেশনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে নেস্টসের সার্কুলার ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একাধিক শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাপ্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। দ্য টেলিগ্রাফ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তাঁদের আশঙ্কা, বাস্তবে এই বিদ্যালয়গুলিতে মূলত শাসক দলের এমপি ও এমএলএ-দেরই আমন্ত্রণ জানানো হবে।

ওই শিক্ষাবিদ বলেন, “এই ধরনের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতারা সরকারের সাফল্য ও দলীয় আদর্শের প্রচার করবেন। এটি শিশুদের মানস গঠনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়ার একটি কৌশলের অংশ। প্রথমে সরকারি স্কুলে এই পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে তা বেসরকারি স্কুলেও ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।”

সমালোচকদের মতে, আদিবাসী শিশুদের জন্য তৈরি আবাসিক বিদ্যালয়গুলির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানসম্মত শিক্ষা, সামাজিক ক্ষমতা বৃদ্ধি  ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে শক্তিশালী করা। সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়মিত উপস্থিতি শিক্ষাক্ষেত্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে রাজনীতিকরণের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন শিক্ষা ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিদ্যালয় পরিসরে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে, তখন নেস্টসের এই নির্দেশ আরও গভীর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে বলে দ্যা ওয়্যার-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সার্কুলার বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে এবং তা আদিবাসী আবাসিক বিদ্যালয়গুলির শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবেশে কী প্রভাব ফেলবে সেদিকেই এখন নজর শিক্ষা মহল ও নাগরিক সমাজের।