নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়
এ আমলে প্রবাদ সৃষ্টি হলে হলে সেখানে নির্ঘাৎ ঠাঁই পেত নতুন লাইন, ‘যার কেউ নেই, তার ট্রোলিং আছে’। বঙ্গজীবনের নবতম অঙ্গ, শিল্পের মরা বাজারে ট্রোলশিল্পই ‘পুষ্পে পল্লবে বিকশিত।'
মেসি কাণ্ডে কারা মাঠে ভিড় বাড়ালেন, কে ছবি তুললেন, কারা দর্শকদের চোখের সামনে মেগাস্টারকে দেখার জন্য প্রতিবন্ধক হলেন সেটা ছাপিয়ে গেল শুভশ্রীকে সোশ্যাল মিডিয়ায় করা আক্রমণ। শুধু ছবি তোলার জন্য বিষোদগার করে ক্ষান্ত থাকলেন না মানুষজন, শুভশ্রীকে অঙ্গভঙ্গি করে, গালিগালাজ দিয়ে, তাঁর সন্তানদের কুৎসিততম শব্দবাণে জর্জরিত করে ক্ষান্ত হলেন।
এ উদাহরণ অবশ্য নতুন নয়, পরমব্রত বিয়ে করলেন, তাঁকে তার কমেন্টবক্সে গিয়ে গালিগালাজ করলেন কিছু মানুষ। গায়িকা ইমন যোগাসনের ভিডিও পোস্ট করলেন, সেখানে অশালীন শব্দ ব্যবহার করলেন কিছু মানুষ। বাবাকে নিয়ে মীর আফসার আলি পোস্ট করলেন,”আমার আব্বা আমার ঈশ্বর” তেড়ে গালিগালাজ দিলেন কিছু মানুষ। কয়েকদিন আগে মহাভারত নিয়ে একটা পডকাস্টে বাণী বসু তাঁর লেখা, মহাভারতের কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা করছিলেন। কিছু মানুষ তাঁকে যে ভাষায় আক্রমণ করলেন, যেটা ছাপার অযোগ্য। বেশিরভাগ মানুষ তাঁকে চিনতে পারলেন না, কিছু মানুষ তাঁর পড়াশোনাকে, তাঁর ব্যাখ্যাকে যুক্তিদিয়ে খন্ডনের চেয়ে এক-দুই শব্দের গালিগালাজে ‘কাউন্টার’ করলেন। লিস্ট করতে শুরু করলে মহাভারতের শ্লোক ছাপিয়ে যাবে, উদাহরণ শেষ হবে না।
রাজনৈতিক নেতাদের ভিডিওর কমেন্টবক্সে বা সংবাদপত্রের সামাজিক মাধ্যমের পাতার কমেন্টবক্সে চোখ বোলানো যায় না। উপচে পড়ে বাছাবাছা শব্দ। মতের বিপক্ষে কেউ বললেই ব্যস, তাঁকে জবাব দেওয়ার উপায়টা সহজ। তাঁর মা-বাবা তুলে গালিগালাজ। তাঁর সন্তানদের ধর্ষণের হুমকি। যে কোনও ইস্যু তুলে নিন, একটা বড় সংখ্যক মানুষ পাবেন যাঁরা নিয়মিত গালিগালাজ করে থাকেন। তাদের জীবনের মূল্যবোধ খুব সহজ, ‘গালি ধ্যান গালি জ্ঞান গালিই মাস্টারস্ট্রোক/ গালি ছাড়া আমি যেন হাসি ছাড়া জোক।'
বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র, সোশ্যাল মিডিয়া। এখানে মনের ভাব যতটা উদারভাবে প্রকাশ করা যায়, অতটা উদারীকরণ মনমোহন সিংও বোধহয় করেননি। কোনও ফিল্টার নেই, কেউ আটকানোর নেই, যখন খুশি, যাকে খুশি, যা খুশি বলার চাবিকাঠি হাতে আছে। সকালে উঠে মনে হল আজকে কাউকে ‘চুলকে দি’ ব্যস, তার পেজ এ গিয়ে উগরে দাও যত বিষ। মনে হল, আরে, এ তো আমার মতো বলছে না, আমার মতের সঙ্গে মিলছে না, দাও থ্রেট। আমার সঙ্গে না মিললে, আমার চেনা ছকের বাইরে গেলেই তুমি নিশানা, তুমিই ডার্টবোর্ড। অর্জুনের চাক্কুর নিশানায় জটায়ু।
কিন্তু কেন এই বারোয়ারি গালিগালাজ? অজস্র কারণ, প্রথমেই তারকাকে হাতের কাছে পাওয়া। যাকে যা খুশি বলার স্বাধীনতা। আগে কাউকে গালিগালাজ দিতে গেলে, আগে তার সঙ্গে দেখা করার, তার ঠিকানায় চিঠি লেখার কষ্টটা করতে হত। এখন তো নিজের বিছানায় শুয়ে, টেবিলে ভাত খেতে খেতে কমেন্টবক্সে বা মেসেজে যা খুশি লিখে দেওয়া যায়। আগে একটা লেখার প্রতিবাদ করতে গেলে, এক বিদ্দ্বজ্জন বা বিখ্যাত কেউ কিছু বললে খবর কাগজে লেখা পাঠাতে হত। টিভির কোনও অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ করতে হলে দর্শকের দরবারে বা চ্যানেলের অফিসে চিঠি পাঠাতে হত। সোস্যাল মিডিয়া দেখাল, কোনও অনুষ্ঠান খারাপ লাগলে সেই নামী শিল্পীকে যা খুশি বলা যায়। কয়েকদিন আগে গৌতম হালদার টেলিভিশনে একটা অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন, তেড়ে তাঁকে খারাপ কথা বলার যেন কম্পিটিশান লেগে যায় সমাজমাধ্যমে। আগে একটা চিঠি সংবাদপত্রে প্রকাশ পেতে হলে কিছু মানদণ্ড পেরিয়ে যেতে হত। ভাষা, শব্দচয়ন, পরিচ্ছন্ন যুক্তি, একটা ন্যুনতম পড়াশোনা। সমাজমাধ্যমে সে বালাই নেই, ওয়াল আমার নিজের, ইন্টারনেট আমার নিজের, সুতরাং যাকে যা খুশি বলতে কোনও বাধা নেই। কোনও সম্পাদক আমার কথা বাতিল করে দেবেন না, অসংসদীয় শব্দ বলা হলে সেটা টিভিতে পড়ে শোনানো হবে না, সে ভয়ও নেই।
সঙ্গে আছে না জানা বা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার চূড়ান্ত উদযাপন। ‘আমি জানি না’ সেটা আজ আর লজ্জার নয়, গর্বের। বুক ঠুকে বলা যায়, “আমি না জানতেই পারি”, মুস্কিল হল না জেনে চুপ থাকতে পারি না। বলতে হবেই। সিনেমা না বুঝলেও সিনেমা নিয়ে বলতে হবে, সাহিত্য কবিতা না বুঝলেও জয় গোস্বামীকে যাচ্ছেতাই বলা যাবে। সৃজিতের একটিও ফ্রেম না বুঝেও তাঁকে গালিগালাজ দেওয়া যাবে। দেব ইন্ডাস্ট্রির জন্য কতটা লাভ বা রেভিনিউ আনছেন, তাতে ক’জনের পেট চলছে, সেটা না জেনে না বুঝে তাঁকে খারাপ কথা বলা যাবে। এই চূড়ান্ত না জানার সেলিব্রেশান, এই অশিক্ষার অহমিকার ব্যাজ বুকে চেপে রেখে তার গর্বিত প্রকাশ, এইটা মারাত্মক। আগে ছিল অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী, এখন অল্পবিদ্যা, শূন্যবিদ্বানকেও বিশেষজ্ঞ বানিয়ে দেয় লাইক বা ফলোয়ারের ঢেউ। ঝগড়া নেগেটিভিটি বিকোয় বেশি, তাই মানুষ লুকিয়ে কলতলার ঝগড়া দেখে। সুতরাং ক্রমাগত নেগেটিভ বলে যাওয়া, নেগেটিভ মানসিকতা ছড়িয়ে দেওয়া ভিউ বাড়াচ্ছে। অ্যালগোরিদম দেখছে অমুকের কথা এত মানুষ শুনলে তার রিচ বাড়াও। সুতরাং ভাল কথা চেপে যাচ্ছে রোজ। আগে বেছে বেছে ভাল লেখা ছাপা হত, ভাল সম্পাদনায় ভাল দৃশ্য শব্দ দেখতেন ও পড়তেন সাধারণ মানুষ। সেই ভালর প্রতি স্পৃহা বাড়ত। এখন যদি চোখের সামনে উদাহরণ থাকে যে গালিগালাজ দিয়ে ভিউ বাড়ে, তাহলে গালিগালাজ হয়ে ওঠে নিউ নর্মাল।
নতুন বছরে তাই হয়ত এই নব্য ট্রোলিং নতুন রেজোলিউশন। হাতের কাছে সেলেব সহজলভ্য। অ্যাপ খুললেই হাতের মুঠোয় তারকারা। খেলা হোক, সিনেমা হোক লেখা হোক, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে মীর আফসার আলির পোস্ট হোক কিংবা মিঠুন দেব-এর ছবি, ট্রোলবাহিনী জানে এ বছরে তাদের টার্গেট আরও আরও বেশি বিষ উগরে দেওয়া। আরও আরও বেশি ইনোভেটিভ খিস্তি, আরও প্রবল বাক্যবাণ। মেঘের আড়ালে সবাই মেঘনাদ। কেউ চিনবে না, কেউ জানবে না, একাধিক ফেক অ্যাকাউন্টে জানাও যাবে না আসল মানুষটি কে, কোথাকার। আর সেই নকল পরিচয়ে থাকা চেহারাটা বলে যাবে আরও আরও বেশি খারাপ কথা, যাতে বছরের শেষে মাংস ভাত খেয়ে নিশ্চিন্তে এটা বলে ঢেকুর তোলা যায় যে, আজকে কাকে গাল দিয়েছি জানিস?
