আজকাল ওয়েবডেস্ক: ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সতর্ক করেছে যে তামিলনাড়ুতে ইসলামিক স্টেট (আইএস) তাদের কৌশলে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু বিপজ্জনক পরিবর্তন এনেছে। সরাসরি হামলা বা তৎপরতার বদলে সংগঠনটি এখন অনলাইনভিত্তিক মতাদর্শগত প্রভাব বিস্তার, ব্রেনওয়াশ  ও ধীরে ধীরে উগ্রপন্থায় ঠেলে দেওয়ার দিকে বেশি জোর দিচ্ছে। গোয়েন্দাদের মতে, এই নীরব কৌশলই দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আরও গভীর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ‘ব্ল্যাক ফ্ল্যাগ সোলজার্স’ ও ইসলামিক স্টেটের নামে পরিচিত একাধিক চরমপন্থী গোষ্ঠী হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই অনলাইন নেটওয়ার্কগুলির মাধ্যমে লাগাতার প্রচারমূলক ভিডিও, উগ্রপন্থী লেখা ও মতাদর্শগত বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। নিরাপত্তা আধিকারিকদের ভাষায়, তামিলনাড়ুতে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ‘নীরব কিন্তু বিপজ্জনক’ র‍্যাডিকালাইজেশন ইকোসিস্টেম।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানাচ্ছে, আপাতত কোনও তাৎক্ষণিক সন্ত্রাসবাদী  হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত নেই। বরং লক্ষ্য হল ধীরে ধীরে মানসিক রূপান্তর ঘটানো, তরুণদের চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলা এবং এমন একটি বৃহৎ সমর্থকভিত্তি তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতে চরমপন্থী প্রচার আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এক আধিকারিকের কথায়, “এখন লক্ষ্য তাৎক্ষণিক হিংসা নয়, বরং মানসিকতা বদলানো। এই প্রক্রিয়াই ভবিষ্যতে বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।”

দক্ষিণ ভারতে ইসলামিক স্টেট সংযুক্ত র‍্যাডিকালাইজেশনের ক্ষেত্রে তামিলনাড়ু দীর্ঘদিন ধরেই গোয়েন্দাদের নজরে রয়েছে। ভারতের প্রথম দিকের যেসব নাগরিক বিদেশে গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছিল, তাদের মধ্যে তামিলনাড়ুর কুড্ডালোর জেলার হাজা ফখরুদ্দিনের নাম উল্লেখযোগ্য, যিনি পরে সিরিয়ায় চলে যান। তদন্তকারীদের দাবি, আইএসের সঙ্গে যুক্ত ভারতের প্রথম দিকের র‍্যাডিকালাইজেশন কেন্দ্রগুলির একটি ওই অঞ্চলেই চিহ্নিত হয়েছিল।

২০১৪ সালের পর থেকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় তামিলনাড়ুর তরুণদের ইসলামিক স্টেটের প্রতীক ও পতাকা হাতে ছবি ছড়িয়ে পড়ে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, কিছু অঞ্চলে ওয়াহাবি মতাদর্শসহ নির্দিষ্ট কট্টর ব্যাখ্যার প্রভাব চরমপন্থী বয়ানকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করেছে। এই ধরনের মতাদর্শগত অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ২০১৫ সালেই একটি কমিউনিটি সংগঠন তামিলনাড়ু সরকারকে চিঠি দিয়ে মসজিদ পরিচালনা কমিটিগুলিতে কট্টর চিন্তাধারার প্রভাব বাড়ছে বলে সতর্ক করেছিল এবং তা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য হুমকি হতে পারে বলে জানিয়েছিল।

সাম্প্রতিক তদন্তও গোয়েন্দা সংস্থার আশঙ্কাকে জোরালো করেছে। জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)-র দাখিল করা একটি চার্জশিটে তামিলনাড়ুর এক বাসিন্দার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে তিনি একাধিক অনলাইন গ্রুপ চালাতেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল যুবসমাজকে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক শান্তির পক্ষে ক্ষতিকর কার্যকলাপকে উসকে দেওয়া।

নিরাপত্তা মহলের মতে, কেরালায় ইসলামিক স্টেট যেভাবে একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি র‍্যাডিকালাইজেশন কৌশল প্রয়োগ করেছিল, তামিলনাড়ুতেও তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে। কেরালায় এই প্রক্রিয়ার ফলেই মহিলাসহ একাধিক ব্যক্তি ভারত ছেড়ে আফগানিস্তানে গিয়ে আইএসে যোগ দিয়েছিল। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ধারাবাহিক নজরদারি ও হস্তক্ষেপ না হলে দক্ষিণ ভারতে আবারও সেই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এর পাশাপাশি, গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ধারণা, ইসলামিক স্টেট আফগানিস্তান–পাকিস্তান অঞ্চলে সক্রিয় তাদের খোরাসান শাখা (আইএসকেপি)-র জন্যও নতুন সদস্য খুঁজছে। এই কারণেই তামিলনাড়ু ও কেরালায় বিশেষভাবে তরুণদের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

নিরাপত্তা আধিকারিকরা জোর দিয়ে বলছেন, এই হুমকি মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা নয়, প্রয়োজন লাগাতার নজরদারি, সমাজ সচেতনতা এবং কার্যকর র‍্যাডিকালাইজেশনের পাল্টা ভাষ্য তৈরির উদ্যোগ। এক আধিকারিকের কথায়, “এটা অস্ত্রের লড়াই নয়, এটা চিন্তার লড়াই। মতাদর্শ হিংসায় পরিণত হওয়ার আগেই হস্তক্ষেপ করতে না পারলে বিপদ আরও গভীর হবে।”