আজকাল ওয়েবডেস্ক: ২০২৪ সালের অপরাধ পরিসংখ্যান নিয়ে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) সাম্প্রতিকতম রিপোর্টটি ভারতের নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার এক জটিল চিত্র তুলে ধরেছে। গত ৬ মে প্রকাশিত এই তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে দেশে অপরাধের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সাইবার অপরাধ এবং শিশু নির্যাতনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় গত বছর মোট অপরাধের সংখ্যা প্রায় ৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫৮.৮৫ লাখে। জনঘনত্বের নিরিখে অপরাধের হারও ৪৪৮.৩ থেকে কমে ৪১৮.৯ হয়েছে। তবে পরিসংখ্যানের এই আপাত স্বস্তি কি প্রকৃত অর্থে অপরাধ কমার ইঙ্গিত, নাকি আইনের মারপ্যাঁচে তথ্যের রূপান্তর—তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, মারধর বা ‘হার্ট’ ক্যাটাগরির অপরাধ এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছে। কিন্তু এনসিআরবি নিজেই স্পষ্ট করেছে যে, এই ব্যাপক পতনের নেপথ্যে রয়েছে নতুন আইন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)। আগে যে অপরাধগুলো পুলিশের খাতায় সরাসরি নথিভুক্ত হতো, তার একটি বড় অংশকে এখন ‘নন-কগনিজেবল’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, যার ফলে সেগুলো আর অপরাধের মূল তালিকায় আসছে না। অর্থাৎ, রাস্তায় মারপিট কমেনি, বরং পুলিশের খাতায় তা ওঠার আইনি বাধ্যবাধকতা কমেছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। দেশে সাইবার অপরাধের দাপট যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে। ২০২৪ সালে ১ লক্ষেরও বেশি সাইবার অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৭২ শতাংশেরও বেশি ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক জালিয়াতি। সাইবার অপরাধের এই মরণফাঁদ থেকে রাজধানী দিল্লিও রেহাই পায়নি, যদিও সেখানে অপরাধের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় সামান্য কমেছে। অন্যদিকে, আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রেও প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যার ৯০ শতাংশই জালিয়াতি এবং জালিয়াতি সংক্রান্ত অপরাধ। জালনোটের কারবারও থেমে নেই; গত এক বছরে কর্তৃপক্ষ প্রায় সাড়ে ৫৪ কোটি টাকার জালনোট বাজেয়াপ্ত করেছে।
নারীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান কিছুটা ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তব চিত্রটি এখনও বেশ করুণ। গত বছর নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা ১.৫ শতাংশ কমেছে ঠিকই, কিন্তু ৪.৪১ লক্ষ মামলার পরিসংখ্যান কোনওভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়। উদ্বেগের বিষয় হল, এর মধ্যে অধিকাংশ অপরাধই ঘটে চেনা পরিধিতে—স্বামী বা আত্মীয়দের হাতে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন ১.২০ লক্ষেরও বেশি নারী। পশ্চিমবঙ্গ এই তালিকায় প্রথম তিনে থাকলেও শীর্ষে রয়েছে উত্তরপ্রদেশ। আবার শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের হার প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে যাওয়া সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কেই স্পষ্ট করে। অপহরণ এবং পকসো (POCSO) আইনের অধীনে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা শিশুদের জন্য এক অনিরাপদ পরিবেশের দিকেই আঙুল তুলছে।
দেশের তফসিলি জাতি ও উপজাতিদের বিরুদ্ধে অপরাধের হার গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে খুনের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিবাদের জেরে গত বছর ২৭ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
অপরাধের পাশাপাশি দেশের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সংকটের একটি ভয়াবহ দিক উন্মোচিত হয়েছে এনসিআরবি-র ‘আত্মহত্যা ও দুর্ঘটনা’ রিপোর্টে। ১.৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ গত বছর আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এর মধ্যে এক বড় অংশই দিনমজুর এবং কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। বিশেষ করে তামিলনাড়ু ও পাঞ্জাবের মতো রাজ্যগুলোতে মাদক সেবনের ফলে মৃত্যুর সংখ্যা এক বছরে ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এক গভীর সামাজিক ক্ষতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সবশেষে, আইনি প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে আশার আলো দেখিয়েছে কেরল। চার্জশিট পেশ করার ক্ষেত্রে কেরল সারা দেশে প্রথম স্থানে রয়েছে, যেখানে ৯৪.৫ শতাংশ মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গও বেশ উপরের দিকেই রয়েছে। সব মিলিয়ে, এনসিআরবি-র এই রিপোর্ট যেমন কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতির কথা বলছে, তেমনই সাইবার জালিয়াতি ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের মতো ক্রমবর্ধমান কাঁটাগুলো উপড়ে ফেলার জন্য প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়ার বার্তাও দিচ্ছে।















