“সব নায়কদের আগে ছিলেন তিনি—রাম” এই বার্তা দিয়ে, বিশ্বজুড়ে থাকা দর্শকের উত্তেজনাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়ে মুক্তি পেল নিতেশ তিওয়ারির বহু প্রতীক্ষিত মহাকাব্যিক সিনেমা ‘রামায়ণ: পার্ট ১’-এর প্রথম ঝলক। যেন নতুন করে জন্ম নিল এক প্রাচীন মহাকাব্য। যেখানে রামচন্দ্রের অবতারে ধরা দিলেন বলিউড তারকা রণবীর কাপুর। আধুনিক সিনেমাটোগ্রাফি এবং হাজার বছরের প্রাচীন আবেগের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়ে এই টিজারটি যেন কেবল একটি সিনেমার ট্রেলার নয়, বরং এক বিশ্বজনীন সাংস্কৃতিক মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নীতেশ তিওয়ারির পরিচালনায় তৈরি এই দুই-পর্বের মহাযজ্ঞ শুধু একটি ছবি নয়। ভারতীয় পুরাণকে গ্লোবাল স্কেলে ফের একবার তৈরির সাহসী চেষ্টা। প্রাইম ফোকাস স্টুডিওস, অস্কারজয়ী ভিএফএক্স সংস্থা ডিএনইজি এবং যশের মনস্টার মাইন্ড ক্রিয়েশন্স—এই তিন সংস্থার সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে এমন এক ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা, যা ভারতীয় সিনেমার সংজ্ঞাই বদলে দিতে পারে।
এই টিজার শুধু একটি চরিত্র উন্মোচন নয়, এক গ্লোবাল ইভেন্ট। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত এই ঝলক স্পষ্ট করে দিল, ‘রামায়ণ’ শুধুমাত্র ভারতীয় দর্শকের জন্য নয়, এটা আন্তর্জাতিক দর্শকদেরও লক্ষ্য করে তৈরি। যারা ছোটবেলা থেকে রাম-কথা শুনে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এটি নস্ট্যালজিয়ার নতুন ভাষা। আর নতুন প্রজন্মের কাছে এ এক অভূতপূর্বভাবে পুরাণকে জানার সুযোগ।

আজকের সিনেমায় নায়ক মানেই প্রায়শই শক্তি, প্রতিশোধ আর ক্ষমতার প্রদর্শন। কিন্তু রাম, তিনি একেবারেই আলাদা।তিনি সেই মানুষ, যিনি ক্ষমতা ত্যাগ করেন,নিজের ইচ্ছাকে চাপা দেন আর বারবার বেছে নেন কর্তব্য। তাঁর নামের পাশে ‘মর্যাদা পুরুষোত্তম’—এই উপাধি শুধু ধর্মীয় নয়, এক গভীর মানবিক দর্শন। নির্বাসন, বিচ্ছেদ, অন্যায়—সবকিছুর মাঝেও তিনি অটল থাকেন নৈতিকতায়। আর সেই কারণেই, হাজার বছর পরেও তাঁর গল্প প্রাসঙ্গিক।
পরিচালক নিতেশ তিওয়ারি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এই গল্পকে শুধু ভাল-মন্দের লড়াই হিসেবে দেখেন না। “রামায়ণের আসল শক্তি তার আবেগে। এটা সিদ্ধান্ত আর তার পরিণতির গল্প। রামের যাত্রা খুব মানবিক সেটাই আমরা তুলে ধরতে চেয়েছি।” এই বক্তব্যেই বোঝা যায়, ছবিটি শুধু ভিএফএক্স বা স্কেলের উপর দাঁড়িয়ে নেই—এর ভিতরেই রয়েছে গভীর আবেগ।
রাম-এর চরিত্রে অভিনয় করা মানেই বিশাল দায়িত্ব। আর সেই জায়গা থেকে রণবীর কাপুরের বক্তব্য যথেষ্ট সংযত, কিন্তু গভীর -“আমি রামকে উপস্থাপন করতে আসিনি, আমি তাঁর থেকে শেখার চেষ্টা করছি। তাঁর সরলতা আর পবিত্রতা বোঝার চেষ্টা, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা।” রণবীরের এই স্বীকারোক্তি থেকেই স্পষ্ট তিনি চরিত্রটিকে শুধুমাত্র অভিনয় করছেন না, বরং আত্মস্থ করার চেষ্টা করছেন।
প্রযোজক নমিত মালহোত্রা রামের গল্পকে দেখছেন এক ভিন্ন দৃষ্টিতে। তাঁর মতে, রামের শক্তি তাঁর জয়ে নয় বরং তাঁর ত্যাগে – “ক্ষমতা নয়, কর্তব্য। নিজস্বতা নয়, বৃহত্তর কল্যাণ। এই দর্শনই রামকে করে তুলেছে চিরন্তন।”
এই ছবির আরেকটি বড় আকর্ষণ—রণবীর কাপুর বনাম যশ। একদিকে রাম—ধর্ম, সংযম ও নৈতিকতার প্রতীক। অন্যদিকে রাবণ—অসীম জ্ঞান ও শক্তির অধিকারী, কিন্তু অহংকারে অন্ধ। যশের রাবণ শুধু খলনায়ক নয়। তিনি জটিল, শক্তিশালী এবং ভয়ঙ্করভাবে মানবিক। এই দ্বন্দ্বই ছবির মূল চালিকাশক্তি।
ছবির কাস্টিংই বলে দিচ্ছে, এ ছবি এক তারকাবহুল মহাযজ্ঞ।
রণবীর কাপুর: রাম
যশ : রাবণ
সাই পল্লবী : সীতা
সানি দেওল : হনুমান
রবি দুবে : লক্ষ্মণ
অরুণ গোভিল: মহারাজা দশরথ
সঙ্গে রয়েছেন দুই অস্কারজয়ী সুরকার হান্স জিমার ও এ আর রহমান—সঙ্গীতে এক আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন।
ছবি নির্মাতাদের মতে, রামায়ণ শুধু ধর্মীয় গল্প নয়—এটা এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি। রামের আদর্শ আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই আবেগকে পাথেয় করেই ২০২৬-এর দীপাবলিতে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাবে ‘রামায়ণ: পার্ট ১’। দ্বিতীয় পর্বটি বর্তমানে নির্মাণাধীন এবং তা মুক্তি পাবে ২০২৭-এর দীপাবলিতে।বাল্মীকির রামায়ণকে ভিত্তি করে তৈরি এই দুই পর্বের সিনেমাটি কেবল ভারতীয়দের জন্য নয়, বরং সারা বিশ্বের কাছে এক অনন্য হিরোর গল্প পৌঁছে দেবে। এমন এক হিরো, যিনি ত্যাগের মাধ্যমে জিতে নিতে পারেন বিশ্ব। ২০২৬-এর দীপাবলি কি তবে কেবল বাজি পোড়ানো নয়, বরং রুপোলি পর্দায় এক নতুন ইতিহাস রচনার সাক্ষী হতে চলেছে? উত্তর মিলবে প্রেক্ষাগৃহে।
















