রবীন্দ্রনাথের গান তাঁর কণ্ঠে মূর্ত হয়ে ওঠে৷ তাঁর গায়কীতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাব আর বোধের অসাধারণ সংমিশ্রণ, প্রেম বিরহ বা নিবেদন সকল মুহূর্তযাপনে তাঁর গায়কী এবং উদাও কণ্ঠের মায়া আবিষ্ট করে রাখে৷ তিনি শিল্পী জয়তী চক্রবর্তী। আধুনিক থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত- তাঁর অনায়াস যাতায়াত৷ ২৫ বৈশাখে রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে আড্ডায় জয়তী চক্রবর্তী। শুনলেন সায়নী মুখার্জি। 

রবীন্দ্রনাথের গান আপনার কাছে ঠিক কী? 

জয়তী: রবীন্দ্রসঙ্গীত মানে উত্তরণের পাঠ, জীবনে উত্তরণের শিক্ষা। 

‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’, এই কথার অর্থ কি আজকের প্রজন্ম বুঝতে পারে?

জয়তী: হ্যাঁ, আজকের প্রজন্মের তাদের মতন করে বুঝতে পারে অবশ্যই। রবীন্দ্রনাথের গানের সবথেকে বড় মজা হচ্ছে যেকোনো গানের অনেক রকমের ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ (explanation) আমরা খুঁজে পেতে পারি যদি চাই, তো সেই জন্য আমি বলব যে এই প্রজন্মের কাছে তাদের মতন করে অবশ্যই অর্থবোধ হয়৷ তারা তাদের মতন করে বোঝে৷ 

এই সময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত নতুন প্রজন্মকে শোনাতে গেলে কোনওরকম বদল কি প্রয়োজন বলে আপনার মনে হয়?

জয়তী: উপস্থাপনার (presentation) বদলের প্রয়োজন অবশ্যই আছে। কারণ এই প্রজন্মের কাছে আমরা যে ধরনের গানবাজনা শুনে বড় হয়েছি, সেই গানবাজনাটা অনেক বেশি বোধকে স্পর্শ করে৷ কিন্তু এখনকার প্রজন্মের বুদ্ধিমত্তা (intelligence) অনেক বেশি, বোধ অনেক কম। তাদের জীবনে এখন উত্তেজনা এত বেশি, সক্রিয়তা (activity) এত বেশি, সচলতা (mobility) এত বেশি যে তারা শান্ত-স্থির থাকা আসলে কাকে বলে সেটা সম্পর্কেই পরিচিত নয়।  রবীন্দ্রনাথের গান তো আমাদের মূলত ভেতর থেকে শান্ত করে, তাই না? তো সেই শান্তির জায়গাটা তারা খুঁজে পাবার জন্য তাদের যে রুট বা পথ দিয়ে যেতে হবে, সেটা কিন্তু শুরুতে উপস্থাপনা। আগে তাকে শুনতে হবে, তবে সে উপলব্ধি (realize) করবে, তবে সে শান্তির পথ খুঁজে পাবে। তো সেই উপস্থাপনার মধ্যে আরও অনেক স্মার্টনেস থাকা দরকার, শব্দবিন্যাস বা সাউন্ডস্কেপের একটা পরিবর্তন হওয়া দরকার, আমার মনে হয়৷ 

এই সময়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

জয়তী: চ্যালেঞ্জ একেবারেই নেই। রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়াটা যেকোনো শিল্পীর ক্ষেত্রেই বোধহয় একটা বড় চ্যালেঞ্জ। গানকে সঠিকভাবে, সঠিক মর্যাদা এবং মূল্যায়ন করে তাকে সঠিক শ্রদ্ধা জানিয়ে ঠিকঠাকভাবে উপস্থাপন করা, এটাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। 

বিশ্বভারতীর নিয়ম অনুযায়ী স্বরলিপি (notation) মেনে গাওয়া, নাকি পছন্দ মতন একটুখানি অদলবদল করা যেতে পারে? এখন তো ফিউশনের সময়, এই বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখেন?

জয়তী: আসলে এটাকেও আমি দুটো ভাগে ভাগ করব। কারণ মঞ্চে আমরা যখন গান করি, অনেক বাদ্যযন্ত্রের (instrumentation) সঙ্গে যখন আমরা গানবাজনা করি, শুরুতে অবশ্যই আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে আমরা স্বরলিপিকেই অনুসরণ করব। কিন্তু ধরা যাক, এমন একটা পরিস্থিতি (situation) তৈরি হল, যেখানে 'পুরানো সেই দিনের কথা' গানটা আমি শুরু করার পরে মাঝপথে আমাকে একটু থামতে হলো, থেমে একসঙ্গে—মানে একটা কৌশল (gimmick) যদি শব্দটা আমি ব্যবহার করি, এটা কিন্তু মঞ্চের জন্য দরকার আছে। প্রয়োজন আছে কারণ আমরা মাঠে-ঘাটে অনুষ্ঠান করি, সেখানে শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার, একাত্ম হওয়ার একটা প্রয়োজনীয়তা আছে অবশ্যই৷  এটাকে ঠিক পরিবর্তন বলব না, এটার সঙ্গে স্বরলিপির কোনো সম্পর্ক নেই; স্বরলিপিতে থেকেও সেটা করা সম্ভব, এটা আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু যদি একটা হলের অনুষ্ঠান হয়, যারা টিকিট কেটে আসছেন, যারা জানেন যে আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত অমুক বা তমুক শিল্পীর কাছে শুনতে যাচ্ছি, তাঁরা জানেন যে কোন শিল্পীর থেকে আসলে কী শুনতে চাইছি, সেখানে এই কৌশলের প্রয়োজন পড়ে না। হয়তো বা পড়ে না। রেকর্ডিংয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু অবশ্যই স্বরলিপি মেনে কোনো রকম বিচ্যুতি না ঘটিয়ে গাওয়া উচিত বলে আমার মনে হয়।

এরকম কোনো গান আছে যেটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনার অর্থ বা জীবনদর্শন বদলে দিয়েছে?

জয়তী: হ্যাঁ, এরকম অজস্র গান আছে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই উত্থান-পতন আসে। সেটা না আসলে মানুষ আত্মশক্তি সম্পর্কে অবগত হয় না৷ খারাপ সময় অনেক গান আমাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে, আমাকে উত্তরণের পথ দেখিয়েছে। যেমন একটা গানের কথা বলতে পারি—'প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে মোরে আরও আরও আরও দাও প্রাণ', 'ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু', 'সুখে আমায় রাখবে কেন রাখো তোমার কোলে', 'দাঁড়াও মন অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড মাঝে', কিংবা খুব সাধারণ 'আকাশ ভরা সূর্য তারা'। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এত মানুষজন, এত প্রাণী, প্রকৃতি সবার মাঝে আমারও এই যে একটুখানি জায়গা হয়েছে এটাই তো আশ্চর্যের।  

 
এখন বাংলা সিরিয়াল হোক বা রান্নার ভিডিও সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের গান, এইটা কোথাও গিয়ে কি গানের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে?

জয়তী: আসলে আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথকে তো সকলের খুব প্রয়োজন, তাই যে যে প্রয়োজনে পারছে লাগাচ্ছে মন্দ কী? তার উদ্দেশ্য সফল (purpose serve) হওয়া নিয়ে কথা। এটা আমি কোনওভাবেই খুব গ্রহণযোগ্যতার জায়গা থেকে দেখি না যে, নায়িকার নাম হিয়া আর নায়ক গান করছে 'আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি'। এটা অত্যন্ত হাস্যকর ব্যাখ্যা। আমি হয়তো সেটার পরিপন্থী, কিন্তু এটাতে যদি একটা সিরিয়ালের গতিময়তা তৈরি হয় এবং সাধারণ মানুষ সেটা গ্রহণ করে আনন্দ পান বা এত কিছু না বুঝে শুধু গানটা শুনছেন ভেবে যদি খুশি হন তাহলে সেটা মন্দ কী? রবীন্দ্রনাথের গানই তো পৌঁছাচ্ছে। সেই গানটা সুস্থভাবে পৌঁছনোটা দরকার। আলু পটলের তরকারিটা তো কেউ দেখবে না যদি না একটা রবীন্দ্রনাথের গান বাজে! মন্ত্র পড়ে বিবাহ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নারীদের যেভাবে দেখানো হয়, যদিও ওইভাবেই মন্ত্র পড়ে আমারও বিয়ে হয়েছে। কিন্তু এখন ভীষণভাবেই মনে হয়  'এসো এসো আমার ঘরে এসো আমার ঘরে', 'স্বপন দুয়ার খুলে এসো'। এই যে সমান যোগ্যতায় সমান মর্যাদায় আর একজনকে আমার জীবনে আহ্বান করা, এটার মধ্যে একটা মহিমা (glory) আছে। এটার মধ্যে ডেফিনেটলি একটা বিবাহ উৎসবটাকে আরও অনেক বড় করে বড় মর্যাদা দিয়ে দেখার একটা জায়গা আছে। সেটাকে আমি সর্বান্তকরণে সমর্থন করি৷ 

 একই রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভিন্ন শিল্পী গাইছেন, স্বাতন্ত্র‍্য তৈরি করার ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি করে?

জয়তী: আমার ক্ষেত্রে করে না। আমি একটা গানকে আমার নিজের গান করে তুলতে পারছি কি না, তাকে আমি আমার মতন করে পরিবেশন (render) করতে পারছি কি না সেটাই আসল কথা৷ গানটা গান হয়ে উঠছে কি না সেটা জরুরি। কার থেকে ভালো গাইছি বা উনি অত্যন্ত ভাল গেয়ে ফেলেছেন আমার তাহলে গাওয়া উচিত নয়, এই ভাবনাগুলো কাজ করে না।

 রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে সবথেকে বড় ভুল ধারণা কী?  

জয়তী: রবীন্দ্রনাথের গান ভীষণ সহজ। অনেক মানুষজন এটাই মনে করেন রবীন্দ্রনাথের গান সবাই গাইতে পারে। এটা ভীষণ সোজা বিষয়। এটাই সবথেকে বড় ভুল ধারণা। 


প্রিয় তিনটে রবীন্দ্রসঙ্গীত?
জয়তী:এটা বলা খুব মুশকিল। ক্রমাগত পাল্টাচ্ছে। এই মুহূর্তে মাথার মধ্যে যেগুলো ঘুরছে সেগুলো বলছি,
'নয়নও তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে', 'জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো',  'আরও আঘাত সইবে আমার'


প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী?
জয়তী: সুবিনয় রায়, সাগর সেন, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখনকার দিনের বললে অবশ্যই শ্রীকান্ত আচার্য, শ্রাবণী সেন, সৈকত শেখরেশ্বর রায়—এদের গান আমার ভীষণ পছন্দ।

মঞ্চে শ্রোতাদের অনুরোধে কোন গানটা সবথেকে বেশি গাইতে হয়?
জয়তী: ‘সখী ভাবনা কাহারে বল’, ‘ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে’, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই', ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে’, ‘বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি’। 

রবীন্দ্রনাথের কোন লাইন আপনাকে খারাপ সময়ে শক্তি দিয়েছে?
জয়তী: 'মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ'।

নিজের গাওয়া কোন রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনার সবথেকে প্রিয়?
জয়তী: কোনো গানই আমার প্রিয় নয়। আসলে প্রিয়টা না ভীষণ বদলাতে থাকে। তবুও ভাললেগেছে ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে’।