আজকাল ওয়েবডেস্ক: আরজি কর হাসপাতালে ও মেডিক্যাল কেলেজে জুনিয়র চিকিৎসক 'অভয়া'র মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিবাদে মুখ হয়েছিল বাংলা। কিন্তু, মেলেনি সুবিচার। পরে মেয়ের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এ বিজেপি প্রার্থী হন তিনি। 
নির্বাচনী লড়াইয়ে পানিহাটিতে জয় পেয়েছেন 'অভয়ার মা' রত্না দেবনাথ। ২৮,৮৩৬ ভোটে তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষকে হারিয়েছেন রত্না। 

৪ মে, রত্না দেবনাথের জীবনে এক বড় মোড়। জয়ী রত্না সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "বাংলার মেয়েরা তাঁদের জবাব দিয়ে দিয়েছেন।" নিজের এই জয়ের কৃতিত্ব তিনি বাংলার মহিলাদেরই দিয়েছেন।

পানিহাটি দীর্ঘকাল ধরেই তৃণমূল কংগ্রেসের এক শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সেখানে পদ্ম ফুল ফুটতেই গেরুয়া আবির উড়ল। রত্না দেবীর মনে তখন মেয়ের সুবিচার পাওয়ার আশা। 

"সে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল"
নিজের জীবন বদলে দেওয়া সেই ভয়াবহ দিনটির কথা স্মরণ করে রত্না দেবনাথ বলেন, তাঁর মেয়ে "হাতে টিফিন নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল", কিন্তু বাড়ি ফিরেছিল ওর নিথর দেহ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, "আমি বা ও - কেউই জানতাম না যে এটাই আমাদের শেষ কথোপকথন হতে চলেছে। আমার মেয়ে ছিল ফুলের মতো। তাঁর মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শ ও মূল্যবোধ ছিল। আরজি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রীই ওর জীবন কেড়ে নিয়েছে।"

রত্না দেবনাথের দাবি, তাঁর নিজের জীবনের চেয়ে মেয়ের জীবন ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 'অভয়ার মা' বলেন, "ও নিজের হাসপাতালেই চলতে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল, ওর সেই লড়াই ছিল অনেক বেশি কঠিন।"

রাজনীতির আঙিনায় রত্না দেবনাথের প্রবেশ
মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁর মেয়ে 'অভয়া'-কে রক্ষা করতে পারেনি। এমন অভিযোগ রত্না দেবনাথ বারবারই করে এসেছেন। তিনি জানান, নিজের মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যেতে এবং পানিহাটিকে 'ঘোষ পরিবার' ও তাদের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত রত্না দেবনাথ বলেন, "২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আমার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী (মমতা ব্যানার্জি) আমার জীবনটা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছেন। আমি এখনও প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছি; আমার মেয়ে এবং বাংলার সমস্ত মেয়েদের জন্য ন্যায়বিচার আদায়ের লড়াইয়ে নামতে আমি রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছি।" 

'অভয়ার মা' দাবি করেন, মেয়েকে হারানোর পর থেকে শোক ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে তিনি আর নিজের চুলে চিরুনি ছোঁয়াননি।

বারবারই তিনি এই প্রশ্ন তুলেছিলেন, "আমার প্রধান শত্রু মমতা ব্যানার্জি, কারণ তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আর আমার মেয়ে স্বাস্থ্য দপ্তরের অধীনেই কাজ করত। মমতা ব্যানার্জি কেন আমার মেয়েকে বাঁচালেন না?" 

ন্যায়বিচারের আহ্বান
নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' প্রকল্প চালু করেন। এই প্রকল্পের আওতায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী নারীদের প্রতি মাসে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এই প্রকল্পে সুবিধাভোগীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা জমা করা হয়।

তবে রত্না দেবনাথ মনে করেন, বাংলার মহিলাদের আর কেবল এই ১,৫০০ টাকার গণ্ডিতে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, "আমি একজন প্রতিবাদী মা মাত্র, এবং আমি ভবিষ্যতেও তেমনই থাকব। বাংলার নারীদের কেবল ১,৫০০ টাকার বিনিময়ে বেঁধে রাখা যায় না।" 

একদিকে রত্না নিজের জয়ের কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী মোদিকে দিয়েছেন, অন্যদিকে তিনি মমতার নাম উচ্চারণ করতেও অস্বীকার করেছেন। সাফ বলেছেন, "আমি ওই মহিলার কথা ভাবতেও চাই না।" 

সবশেষে, রত্না দেবনাথ তাঁর প্রয়াত মেয়ের কথা স্মরণ করেন এবং তাঁকে 'ঈশ্বরের দেওয়া এক অমূল্য হীরে' বলে বর্ণনা করেন। 'অভয়ার মা' বলেন, "এটা কেবল আমার একার ক্ষতি নয়, এটা সমগ্র সমাজের ক্ষতি। সমাজ একজন অত্যন্ত দক্ষ চিকিৎসককে হারিয়েছে। আর বাংলার মানুষ এখন ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনার সংকল্প গ্রহণ করেছে।"