শাহের ঘনিষ্ঠ, প্রচারবিমুখ সংগঠক, বিজেপির সুনীল বনসলের কৌশলেই মমতা এবং তৃণমূল কুপোকাত
৫ মে ২০২৬ ১৫ : ৫২
- 1
- 23
বাংলায় ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বিজেপি। ২০৭টি আসনে জয়লাভ করেছে গেরুয়া শিবির, তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। বাকি দুটো আসনে জিতেছে আম জনতা উন্নয়ন পার্টি, দুটো কংগ্রেস, একটি আইএসএফ এবং একটি সিপিআইএম জিতেছে।
- 2
- 23
দলটির সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যগুলিতে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন সুনীল বনসল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অভাবনীয় বিজয়ের প্রধান স্থপতি হিসেবে ধরা হচ্ছে তাঁকে।
- 3
- 23
যদিও এই জয়ে বেশ কয়েকজন নেতার অবদান ছিল, তবে এই যুগান্তকারী সাফল্যের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীলকেই কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে।
- 4
- 23
৫৭ বছর বয়সী সুনীল দলের মধ্যে প্রচারবিমুখ সংগঠক হিসেবে পরিচিত। তিনি সংমাধ্যমের আলো থেকে দূরে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির টানা জয়, ওড়িশা ও তেলেঙ্গানায় শক্তিশালী পারফরম্যান্স এবং এখন পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক জয়ে তাঁর নিরব সাংগঠনিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
- 5
- 23
রাজস্থানের বাসিন্দা সুনীল আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে তিনি প্রচারক হিসেবে আরএসএসে যোগ দেন এবং পরে বিজেপির মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
- 6
- 23
২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে আরএসএস তাঁকে বিজেপিতে পাঠায়। তাঁকে উত্তরপ্রদেশের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন অমিত শাহ জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাজ্যের দায়িত্বে ছিলেন। সুনীল তাঁর শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে শাহকে মুগ্ধ করেছিলেন।
- 7
- 23
‘পান্না প্রমুখ’ এবং ‘মেরা বুথ সবসে মজবুত’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তিকে সংহত করা এবং বুথ পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করার বিষয়ে শাহের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
- 8
- 23
২০১৪ সালে বিজেপি উত্তরপ্রদেশের ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক ৭৩টিতে জয়লাভ করে। এরপর সুনীলকে রাজ্যের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বসানো হয়।
- 9
- 23
২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপুল বিজয়ের জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন এবং ২০১৯ ও ২০২২ সালের সাফল্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি টানা আট বছর উত্তরপ্রদেশে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- 10
- 23
২০২২ সালে, যোগী সরকারের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর, সুনীলকে দিল্লিতে বদলি করা হয় এবং জেপি নাড্ডার দলে জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তাঁকে ওড়িশা, তেলেঙ্গানা এবং পশ্চিমবঙ্গ-সহ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
- 11
- 23
ওড়িশায় বনসাল বিজেপির সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করে নবীন পট্টনায়কের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে দেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ২১টি আসনের মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করে এবং প্রথমবারের মতো রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।
- 12
- 23
তেলেঙ্গানায় তাঁর কৌশল বিজেপিকে আসন সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে, দলটি ১৭টি আসনের মধ্যে আটটিতে জয়লাভ করে। তবে, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির পারফরম্যান্সে অবনতি দেখা যায়। ২০১৯ সালে ১৮টি আসনে ৪০.৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সেখান থেকে ২০২৪ সালে ১২টি আসনে নেমে আসে। প্রাপ্ত ভোট ৩৮.৭৩ শতাংশ।
- 13
- 23
দমে না গিয়ে সুনীল অবিলম্বে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেন। তিনি অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধান, রাজ্য শাখা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, অসন্তুষ্ট নেতাদের ফিরিয়ে আনা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ করার উপর মনোযোগ দেন।
- 14
- 23
তিনি বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠনকে শক্তিশালী করেন, বুথ-স্তরের কাঠামো সক্রিয় করেন, তথ্যনির্ভর ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেন এবং প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় জাতিগত সমীকরণ, স্থানীয় সমস্যা ও প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেন।
- 15
- 23
প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে তিনি আরএসএসের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখেছিলেন। অমিত শাহের ১৫ দিনের রাজ্য সফরকালে তাঁর সঙ্গে কাজ করে, সতর্কতার সঙ্গে তাঁর নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছিলেন। অসন্তুষ্ট নেতাদের অভিযোগ নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
- 16
- 23
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব, রাজ্যের নির্বাচন ইন-চার্জ এবং সহ-ইন-চার্জ ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব ও বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্যর সঙ্গে বনসল শাহের কৌশল বাস্তবায়ন করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক জয় এনে দেয়।
- 17
- 23
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগানটি তিনিই তৈরি করেছিলেন। এই নির্বাচনে ছোট ছোট জনসভার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের ৫৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে ১২ হাজারেরও বেশি পথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়াও, ভোটারদের, বিশেষ করে মহিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১,৬৫,০০০ ছোট সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
- 18
- 23
নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে, প্রাথমিকভাবে মমতা ব্যানার্জিকে নিশানা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, বরং তৃণমূলের বিধায়কদের বিরুদ্ধে একটি পরিবেশ তৈরির প্রচার অভিযান শুরু করা হয়। এই প্রচারের অংশ হিসেবে, বিজেপি প্রায় ৮০টি সাংবাদিক সম্মেলন করে এবং প্রায় ২২০টি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল বিধায়কদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জারি করে।
- 19
- 23
পরবর্তীকালে, দ্বিতীয় পর্যায়ে জেলা পর্যায়ে অভিযোগপত্র জারি করা হয়। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মমতা ব্যানার্জী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জারি করে কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন। এই প্রচারণার প্রভাব এতটাই ছিল যে টিএমসি তাদের ৭৭ জন প্রার্থী পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়।
- 20
- 23
যুবক ও মহিলাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং যুব কার্ড ও মাতৃশক্তি কার্ড প্রকল্পের অধীনে লক্ষ লক্ষ ফর্ম পূরণ করা হয়েছিল। গোটা নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ৬৪০টি র্যাশলি আয়োজন করা হয়েছিল।
- 21
- 23
প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রায় ৪২টি সাংগঠনিক জেলায় ১৯টি র্যাালি ও দু’টি রোড শো করেন। শাহ ২৯টি সাংগঠনিক (২৩টি প্রশাসনিক) জেলায় ২৯টি র্যারলি ও ১১টি রোড শো করেন। বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনও নির্বাচনী প্রচার চলাকালীন প্রায় ১৭টি সভা করেন।
- 22
- 23
শান্ত স্বভাব ও সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত বনসলকে প্রায়শই বিজেপির ‘নির্বাচনী প্রকৌশলী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জেপি নাড্ডার পর বিজেপির জাতীয় সভাপতি পদের জন্য এর আগেও তাঁর নাম আলোচিত হয়েছিল। সেই দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত নিতিন নবীনকে দেওয়া হয়। একইভাবে, তিনি রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী পদের অন্যতম দাবিদার ছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত ভজনলাল শর্মাকেই বেছে নেওয়া হয়।
- 23
- 23











