আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক 'যুদ্ধ'। রাজ্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এই বিধানসভা কেন্দ্রে এবার লড়াই শুধু দলীয় নয় বরং 'গুরু' বনাম 'শিষ্য'। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্রে এবার মূল লড়াই হতে চলেছে কংগ্রেস নেতা তথা প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ অধীর রঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত বহরমপুর পুরসভার চেয়ারম্যান তথা দলের বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখার্জির মধ্যে। যদিও গত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপি-র প্রতীকে জয়ী হয়েছিলেন অধীরের অপর এক 'প্রাক্তন শিষ্য' সুব্রত মৈত্র কাঞ্চন। তবে অধীর চৌধুরীকে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটি বহরমপুর কেন্দ্রে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়াই অনেকেই মনে করছেন লড়াই এবার সরাসরি কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে।   
তবে তৃণমূল নেতৃত্ব এই লড়াইকে গুরু বনাম শিষ্যের লড়াই বলে মানতে রাজি নন।  তাঁদের বক্তব্য এই লড়াই পুরনো সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন  প্রজন্মের লড়াই। 

তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকে বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে নাড়ুগোপাল মুখার্জির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এআইসিসির তরফ থেকে এখনও অধীর চৌধুরীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে মুর্শিদাবাদ জেলা কংগ্রেসের তরফ থেকে ইতিমধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে অধীর চৌধুরী বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রেই  লড়াই করবেন। 

বিধানসভা নির্বাচনের  লড়াইয়ের জন্য ইতিমধ্যেই বহরমপুর শহরে পৌঁছে গিয়েছেন অধীর চৌধুরী। সূত্রের খবর ,নিজের 'পয়া' চৌধুরী ভিলা  থেকে ফের একবার নির্বাচনী যুদ্ধে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। বৃহস্পতিবারও সাংবাদিকদের সঙ্গে 'চৌধুরী ভিলা'য় বসে কথা বলেছেন অধীরবাবু। 

১৯৯১ সালে নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের প্রতীকে প্রথমবার লড়ে পরাজিত হয়েছিলেন অধীর চৌধুরী। ঠিক পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালে জীবনের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখার্জি।  তবে ৫ বছর আগে হওয়া 'ভুল ত্রুটি' শুধরে নিয়ে তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখার্জি এবার অধীর চৌধুরীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য প্রস্তুত। 

তৃণমূল কংগ্রেস যে বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসকেই  তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করছেন তা দলের ভোট কৌশলে মোটামুটি পরিষ্কার। ইতিমধ্যেই নাড়ুগোপাল মুখার্জি তাঁর একাধিক বক্তব্যে কংগ্রেসের প্রাক্তন সাংসদকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তৃণমূল প্রার্থীর অভিযোগ, অধীর চৌধুরীর আমলে বহরমপুর শহরে যে দুর্নীতি হয়েছে তার জন্যই উন্নয়ন স্তব্ধ হয়েছিল।  রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পর মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে বহরমপুর শহরের চেহারা আমূল পাল্টে গিয়েছে।। শহরে তৃণমূল কর্মীরা এখন ২৪ ঘন্টা মানুষকে পরিষেবা দিচ্ছেন। 

অন্যদিকে বহরমপুরের প্রাক্তন কংগ্রেস সাংসদ অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, বহরমপুর পুরসভায় ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি হয়েছে এবং তৃণমূল নেতারা বিভিন্ন রকমের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অধীরবাবু বলেন ,"আমি বহরমপুরে বহিরাগত নই। আমি এখানকার সাংসদ ছিলাম। বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি বহরমপুর লোকসভার অধীনেই পড়ে। সাধারণ মানুষ যদি আমাকে চায় ,এটা আমার কাছে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো।"

তবে মুর্শিদাবাদ জেলার রাজনৈতিক তথ্যভিজ্ঞ মহলের মত, গত পাঁচ বছরে বহরমপুর শহরে তৃণমূল কংগ্রেস যে উন্নয়নের কাজ করেছে তার 'সুফল' এবার ঘরে তুলতে চলেছে শাসক দলের প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখার্জি। পাশাপাশি অধীর চৌধুরীর 'রবিনহুড ইমেজ'ও  বহরমপুরবাসী ভুলতে বসেছে। কংগ্রেসকে যে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না তার প্রমান দেশ জুড়ে বিভিন্ন রাজ্যে হওয়া একাধিক নির্বাচনে পাওয়া গিয়েছে। 

তাই তৃণমূল নেতৃত্ব 'অচল' অধীরকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে নারাজ। দলের নেতারা ভোটের সমীকরণ বিশ্লেষণ করে জানান, বহরমপুর পুরসভা  এলাকায় কংগ্রেস ,বিজেপি এবং তৃণমূল প্রায় সমান সমান ভোট পেলেও বহরমপুর বিধানসভা এলাকার অন্তর্গত যে গ্রামীণ অংশগুলো রয়েছে সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস অনেকটাই 'অ্যাডভান্টেজিয়াস' জায়গায় থাকবে। গ্রামীণ এলাকা থেকে পাওয়া 'লিড' চূড়ান্ত পর্যায়ে তৃণমূল প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করবে। 

জেলা তৃণমূলের এক নেতা বলেন ,একসময় মনে করা হত অধীর চৌধুরীকে লোকসভা নির্বাচনে হারানো সম্ভব নয়। সেই 'মিথ' ২০২৪-এর নির্বাচনে ইউসুফ পাঠান ভেঙে দিয়েছেন। দলের সমস্ত কর্মীরা আশাবাদী আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে নাড়ুগোপাল মুখার্জি ফের একবার সেই 'মিথ' ভেঙে দেবেন। তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য- 'গুরুমারা বিদ্যাতেই' পরাজিত হবেন অধীর। 

তবে অধীর চৌধুরীকে নিজের গুরু বলেই স্বীকার করতে রাজি নন তৃণমূল প্রার্থী নাড়ুগোপাল মুখার্জি। তিনি বলেন,"বহরমপুর পুরসভার একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে একসময় আমি কংগ্রেস করতাম ঠিকই কিন্তু তা চাপে পড়ে করতাম। অধীর চৌধুরী কোনওদিনই আমার 'গুরু' ছিলেন না। তাঁকে আমার কখনই ভালো লাগত না।"
 
তিনি বলেন, "এই লড়াই আদৌ গুরু-শিষ্যের লড়াই নয়,এই লড়াই তারুণ্যের সঙ্গে বার্ধক্যের লড়াই।"