আজকাল ওয়েবডেস্ক: এমন একটি পরিস্থিতির কথা ভাবুন। দুই বন্ধু একই সময়ে বিনিয়োগ শুরু করলেন। দু'জনেই প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা বিনিয়োগ করচেন। একজন বেছে নিলেন একটি নিরাপদ এফডি (ফিক্সড ডিপোজিট), অন্যজন মিউচুয়াল ফান্ডে এসআইপি (সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান)। পাঁচ বছর পর, দুই বন্ধু তাঁদের বিনিয়োগের ফলাফল তুলনা করলেন। শেষমেশ কে এগিয়ে রইলেন?

এর উত্তরটি যতটা সহজ মনে হতে পারে, বাস্তবে ততটা সহজ নয়।

রিটার্নের ব্যবধান: কাগজে-কলমে ছোট, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে
পাঁচ বছরের সময়কালে, ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকার এসআইপি বিনিয়োগ ১০-১২ শতাংশ হারে বেড়ে আনুমানিক ৩.৮ থেকে ৪.২ লক্ষ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এর তুলনায়, Vibhvangal Anukulakara Pvt Ltd-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিদ্ধার্থ মৌর্য জানান, একটি এফডি বা আরডি ৬-৭ শতাংশ হারে বেড়ে প্রায় ৩.৪ থেকে ৩.৬ লক্ষ টাকায় পৌঁছাতে পারে।

সিদ্ধার্থ মৌর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, “ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকার এসআইপি বিনিয়োগ পাঁচ বছর পর একটি রিকারিং ডিপোজিটের (আরডি) চেয়ে ভাল রিটার্ন দিতে পারে, কারণ এর রিটার্ন বাজারের গতিবিধির ওপর নির্ভরশীল; অন্যদিকে, এফডি বা ফিক্সড ডিপোজিটগুলো স্থিতিশীল হলেও তুলনামূলকভাবে কম হারে বৃদ্ধি পায়।”

প্রথমে, এই ব্যবধানটি হয়তো খুব একটা বড় বা নাটকীয় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে, রিটার্নের ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্যও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একত্রিত হয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবধানে পরিণত হতে পারে।

স্থিতিশীলতা বনাম বৃদ্ধি: কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
আসল পার্থক্যটি নিহিত রয়েছে এই দু'টি বিনিয়োগ মাধ্যমের আচরণের মধ্যে। এফডি-র ফলাফল আগে থেকেই অনুমান করা সম্ভব। মেয়াদ শেষে আপনি ঠিক কত টাকা পাবেন, তা আপনার জানা থাকে। অন্যদিকে, এসআইপি-এর গতিবিধি বাজারের ওঠানামার সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং বিনিয়োগের যাত্রাপথে এর মূল্যে উত্থান-পতন দেখা দিতে পারে।

Scripbox-এর ম্যানেজিং পার্টনার শচীন জৈন বিষয়টি এভাবে তুলে ধরেন, “এসআইপি এবং এফডি-র উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফিক্সড ডিপোজিটগুলো নিশ্চিত বা অনুমানযোগ্য রিটার্নের নিশ্চয়তা দেয়, অন্যদিকে এশআইপি-র ফলাফল বাজারের ওপর নির্ভরশীল এবং বাজারের মন্দা চলাকালীন পাঁচ বছরের মেয়াদে প্রত্যাশার চেয়ে কম রিটার্নও দিতে পারে।”

অন্য কথায় বলা যায়, একটি নিশ্চিত ফলাফলের নিশ্চয়তা দেয়, আর অন্যটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।

চক্রবৃদ্ধি সুদের প্রভাব: একই ধারণা, ভিন্ন গতিপথ
এশআইপি এবং এফডি - উভয় বিনিয়োগ মাধ্যমই চক্রবৃদ্ধি সুদের সুবিধা পায়, তবে এই বৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি দেখতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এফডি-র ক্ষেত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ একটি স্থিতিশীল ও নির্দিষ্ট হারে বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, এশআইপি-র প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে বাজারের পারফরম্যান্স বা ফলাফলের ওপর, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের বৃদ্ধির গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

উভয় ক্ষেত্রেই চক্রবৃদ্ধি সুদের নীতি কাজ করে, তবে তা ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে। এফডি-তে, একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এসআইপি-তে, বাজারের পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে রিটার্ন চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

মৌর্য উল্লেখ করেন যে, এসআইপি ডাইনামিক কম্পাউন্ডিং এবং রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং থেকে সুবিধা পায়, যেখানে বিনিয়োগকারীরা দাম কম থাকাকালীন বেশি ইউনিট কেনেন, যা দীর্ঘমেয়াদী রিটার্ন বাড়াতে পারে।

এই পার্থক্য বোঝার জন্য জৈন একটি সহজ উপায় বলেছেন, “৬ শতাংশ হারে টাকা দ্বিগুণ হতে প্রায় ১২ বছর সময় লাগতে পারে, যেখানে ১২ শতাংস হারে তা প্রায় ৬ বছরে দ্বিগুণ হতে পারে।”

তবে তিনি এও সতর্ক করেন, “ইকুইটি কম্পাউন্ডিং-এর সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।”

অস্থিরতা: বন্ধু না শত্রু?
বাজারের ওঠানামা প্রায়শই বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তিতে ফেলে, কিন্তু এসআইপি-র ক্ষেত্রে এটি আসলে সহায়ক হতে পারে।

মৌর্য ব্যাখ্যা করেন যে, বাজার মন্দার সময় বিনিয়োগকারীরা কম দামে বেশি ইউনিট জমা করতে পারেন, যা বাজার পুনরুদ্ধার হলে রিটার্ন বাড়াতে পারে। জৈন একমত, তবে তিনি যোগ করেন, “বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য উপকারী, কিন্তু পাঁচ বছরের মতো স্বল্প সময়ের ক্ষেত্রে রিটার্ন অসমান হতে পারে।”

সহজ কথায়, ধৈর্য এক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

কর: নীরব পার্থক্যকারী
কর ব্যবস্থা নীরবে আপনার চূড়ান্ত রিটার্নকে প্রভাবিত করতে পারে। আপনার আয়কর স্তর অনুযায়ী প্রতি বছর ফিক্সড ডিপোজিটের (এফডি) সুদের উপর কর ধার্য করা হয়, যা আপনার লাভ কমিয়ে দিতে পারে।

মৌর্য বলেন, “ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) থেকে প্রাপ্ত সুদের উপর আপনার আয়কর স্তর অনুযায়ী বার্ষিক কর ধার্য করা হয়, যা কর-পরবর্তী রিটার্ন কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে উচ্চ আয়কারীদের ক্ষেত্রে।” “অন্যদিকে, ইক্যুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি)-এর উপর শুধুমাত্র টাকা তোলার সময় কর ধার্য করা হয়।”

আচরণ: নির্ণায়ক
মজার বিষয় হল, উভয় বিশেষজ্ঞই একমত যে বিনিয়োগকারীর আচরণ প্রায়শই পণ্যের চেয়ে বেশি ফলাফল নির্ধারণ করে।

বাজার দরপতনের সময় এসআইপি বন্ধ করা, অতীতের লাভজনক বিনিয়োগের পিছনে ছোটা, বা কম সুদের এফডি অন্ধভাবে নবায়ন করা - এই সবই ফলাফলের ক্ষতি করতে পারে। জৈন যেমন বলেন, “সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসআইপি-কে সফল করার জন্য শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতাই মূল চাবিকাঠি।”

তাহলে, আপনার কোনটি বেছে নেওয়া উচিত?
এর কোনও একটি নির্দিষ্ট উত্তর নেই যা সবার জন্য প্রযোজ্য। যদি আপনার অগ্রাধিকার নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীল রিটার্ন হয়, তবে এফডি আপনার জন্য বেশি উপযুক্ত। আর যদি আপনি উচ্চতর বৃদ্ধির জন্য কিছুটা ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক হন, তবে এসআইপি আপনার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।

মৌর্য বিষয়টি চমৎকারভাবে সারসংক্ষেপ করেছেন: “সম্পদ গড়ার ক্ষেত্রে এসআইপি-গুলো অধিকতর উপযোগী, অন্যদিকে মূলধন সুরক্ষার জন্য এফডি-গুলোই বেশি মানানসই।”

সেই দুই বন্ধুর প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক - তাদের একজনের হয়তো এসআইপি-এর মাধ্যমে অধিকতর মুনাফা অর্জিত হবে, তবে এর জন্য তাকে বাজারের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। অপরজন হয়তো এফডি-এর মাধ্যমে সামান্য কম আয় করবেন, কিন্তু তাকে অপ্রত্যাশিত কোনও পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে অনেক কম।

বাস্তবক্ষেত্রে, একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে পুরোপুরি বর্জন করাটা হয়তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল - অর্থাৎ, স্থিতিশীলতার জন্য এফডি এবং বৃদ্ধির জন্য এসআইপি-র ব্যবহার—উভয় ক্ষেত্রেরই সেরা সুফলটি এনে দিতে পারে।

কারণ দিনশেষে, বিনিয়োগ মানে কেবল দু'টি বিকল্পের মধ্যে ‘উত্তম’ বিকল্পটি বেছে নেওয়া নয়। বিনিয়োগের মূল কথা হল - বিনিয়োগে অটল থাকা, সুশৃঙ্খলভাবে তা চালিয়ে যাওয়া এবং সময়কে তার নিজস্ব কাজটুকু করতে দেওয়া।