আজকাল ওয়েবডেস্ক: আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের লাগামছাড়া দাম, বিদেশি বিনিয়োগে দুর্বলতা এবং মার্কিন বন্ডের চাপে ফের বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় মুদ্রা। মঙ্গলবার ডলারের তুলনায় টাকার মূল্য নেমে দাঁড়ায় ৯৬.৪৪, যা এখনও পর্যন্ত সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তর। এর আগে সোমবার টাকা ৯৬.৩৮৭৫ স্তরে পৌঁছে রেকর্ড গড়েছিল।


ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ ঘিরে পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা শুরু হওয়ার পর থেকেই টাকার ওপর চাপ বাড়তে থাকে। গত কয়েক মাসে ভারতীয় মুদ্রার মূল্য প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে, ফলে চলতি বছরে এশিয়ার সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করা মুদ্রাগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছে রুপি।


বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে তিনটি বড় কারণ টাকার এই দুর্বলতার জন্য দায়ী। প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, ভারতে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর তৃতীয়ত, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ফলন বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝুঁকছেন।


ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানির জন্য আরও বেশি ডলার খরচ করতে হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে টাকার ওপর। ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতির কারণে গত কয়েক মাসে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাজারকে আরও অস্থির করে তুলেছে।


এর ফলে ভারতের আমদানি ব্যয় দ্রুত বাড়ছে এবং চলতি হিসাবের ঘাটতিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের অনুমান, চলতি অর্থবর্ষে ভারতের ব্যালান্স অফ পেমেন্টস ঘাটতি ৬৫ থেকে ৭০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছতে পারে। যদি তা সত্যি হয়, তবে টানা তৃতীয় বছর ভারতের বৈদেশিক লেনদেন ঘাটতিতে থাকবে।


আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি-র মতে, ভারত এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে স্থিতিশীল বিদেশি বিনিয়োগ টানতে হবে। কিন্তু অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি নিয়ে উদ্বেগ এবং দুর্বল পোর্টফোলিও বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।


পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসা রেমিট্যান্সেও চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।


এদিকে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ফলনও দ্রুত বেড়েছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভ আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা বেশি হারে ডলারে বিনিয়োগ করছেন। ফলে ডলার আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং উদীয়মান অর্থনীতির মুদ্রাগুলির ওপর চাপ বাড়ছে।

 


টাকার পতন ঠেকাতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বাজারে ডলার বিক্রি করে হস্তক্ষেপ করছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ও আমদানি নিয়ন্ত্রণে কিছু নীতিগত পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বেশি থাকলে এবং বিদেশি বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে আগামী দিনেও টাকার ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।