আজকাল ওয়েবডেস্ক: দু কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে মেলা বসেছে। চারটি মঞ্চে চলছে নানা অনুষ্ঠান। একদিকে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে, এসআইআরের শুনানির পাশাপাশি বিক্ষোভ চলছে নানা জায়গায়, চলছে পূর্বস্থলীতেও, পথে শাসক, বিরোধী দু পক্ষই। এমন সময়ে রাজ্যের ব্যস্ত মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ পূর্বস্থলীর কৃষি মেলায় কী করছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল মেলার মাঠেই। সত্তরোর্ধ স্বপনবাবু চরকির মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন এ মাঠ থেকে ও মাঠ। রাজনীতির মাঠের পুরনো খিলাড়ী স্বপন দেবনাথ একজন এক্টিভিস্টের মত কাজ করেন। গোটা এলাকায় তাঁর নানা কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে আছে।
আজ নয় মন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু সিকি শতাব্দী আগে যখন তিনি বিধায়কও হন নি, নেহাতই একজন তৃণমূল নেতা, তখন থেকেই এই মেলার জন্ম। খাল বিল উৎসব, যাত্রা উৎসব পেরিয়ে শ্রীরামপুরে বছর শুরুর এই কৃষি, হস্তশিল্প, প্রাণীসম্পদ মেলা তার তিন ফলার একটি। এ বছর ভোট দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই শান্তিনিকেতন পৌষমেলার ধাঁচের এই মেলাও এগিয়ে এসেছে অনেকটাই।
একদিকে যেমন ওয়ার রুম সামলাচ্ছেন, দলের নানা কর্মসূচি, বিক্ষোভে সামনে থাকছেন, পাশাপাশি এই মেলার পরিসরেও পুরনো পরিচয় আবার ঝালিয়ে নিচ্ছেন স্বপন দেবনাথ। লোকশিল্পী থেকে হস্তশিল্পের কারিগর সবার কাছে জনে জনে গিয়ে কুশল সংবাদ নিচ্ছেন। খাওয়া-দাওয়া হয়েছে কী না জিজ্ঞেস করছেন। আর এর ফাঁকেই সেরে নিচ্ছেন জরুরি কথাও। কাগজপত্র সব ঠিক আছে কী না। কোথাও অসুবিধা হচ্ছে কী না। প্রকৃত ভোটার যাতে বাদ না যায় বলছেন সে কথাও।
সাতদিনের এই মেলায় কয়েকশো স্টলে কারো কোনও ভাড়া লাগে না। ছাব্বিশ বছর ধরে তাঁরা আসছেন। উলটে নানা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। মেলায় একেক দিন এক এক শ্রেণীর মানুষের জন্য দিন ঠিক করা আছে। শ্রমজীবী দিবসে নানা বেনিফিট তুলে দেওয়া হয় খেটে খাওয়া গরিবদের হাতে। মেলায় আসা ব্যাপারীরাও খুশি। দর্শকদের মত, এ মেলা ঘর আর বাইরের জগতকে মিলিয়ে দেবার মেলা।
আসলে এই এক মেলাতেই অনেক মজা। জানা গিয়েছে, চার চারটি মঞ্চ আর তিনটি বিশাল আকারের মাঠে এই মেলা বসেছে। লোকসংস্কৃতি, কৃষি, আদিবাসী জীবনচর্যাকে তুলে ধরতে এই মেলার পরিধি আর পরিসর টক্কর দেবে রাজ্যের যে কোনও মেলাকে। এমনকী শান্তিনিকেতন পৌষমেলার সঙ্গেও এই মেলার তুলনা চলে আসতে পারে।
প্রভাবে শান্তিনিকেতন অনেক বড়। কিন্তু আড়াই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের পূর্বস্থলীর লোকসংস্কৃতি ও কৃষি মেলাও আয়তনে অনেক বড়। মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের পঁচিশ বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা এই মেলা পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী, নবদ্বীপ, কালনা, কাটোয়ার মানুষের বছর শুরুর বিনোদন। এই মেলায় এলে আপনি টের পাবেন মাটির সুর, মাটির মানুষের প্রাণস্পন্দন।
আজ থেকে পাঁচশো বছর আগে এই অঞ্চল থেকে চৈতন্যের নবজাগরণ যে তরঙ্গ তৈরি করেছিল, এ অঞ্চলের পরতে পরতে তা বহমান লোকজীবনে। এই মেলা সেই প্রাণশক্তিকে তুলে ধরেছে। পূণ্যতোয়া ভাগিরথীর এই অববাহিকায় মাটি যেমন উর্বর, মানুষ ততটাই আন্তরিক।
মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের উদ্যোগে এই মেলা এবারে ছাব্বিশ বছরে পা দিল। দু কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জুড়ে তিনটি বিশালায়তন মাঠ আর চারটি মঞ্চে এই মেলা চলছে সাতদিন ধরে। কৃষি আর লোকসংস্কৃতির সম্পৃক্ত লোকজীবনকে প্রতিফলিত করছে এই মেলা।
মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ জানান, কৃষি, লোকসংস্কৃতি, আদিবাসী সংস্কৃতি ও হস্তশিল্পের মেলা এটি। এই মেলার মধ্যেই প্রতিদিন নানা দিবস পালিত হয়৷ গ্রামের চাষী, মেয়ে বৌয়েরা স্বয়ম্ভরতার পাঠ নেন। আছে মঞ্চ আলো করা গোটা দেশ থেকে উঠে আসা লোকগান, শ্রমজীবি মানুষের শ্রমের ফাঁকে জীবনকে ছুঁতে চায় যে লোকগান। এবারের মেলাতেই এসেছে রাজস্থান, আসাম, উত্তরাখন্ড সহ ১০ টি প্রদেশের নাচ,গান। এ বাংলার বাউল, ফকির, ভাটিয়ালি, দরবেশ, মারফতি গানের প্রবাহ তো আছেই, এছাড়াও মেলাজুড়ে আছে আরও নানা আকর্ষণ। কী নেই নেই এ মেলায়।
একদিকে রয়েছে হাতেগরম পিঠেপুলি, জিলিপি, মালপোয়া, কাঠিভাজা থেকে মোমো, মাছ আর মাংসের স্টল। তেমনই
মেলার মাঠে আছে অজস্র লোকশিল্পের সম্ভার। কাঠের কাজ, ধাতুর কাজ, কাপড়ের কাজ। তাঁতের কাজ। আছে বিদেশী কুকুর থেকে সবজি আর ফসলের প্রদর্শনী। নানা ধরণের জামাকাপড়, প্রসাধনী, গেরস্থালির টুকিটাকি সব কিছু এখানে মাঠজুড়ে বেচাকেনা চলছে।
এই মেলার মাঠজুড়ে রয়েছে সার, বীজ, ওষুধ, কীটনাশক, কৃষিজ পণ্য আর সরঞ্জামের স্টল। রয়েছে মাছ, মাংস কোয়েল সহ নানারকমের খাবারের স্টল। আছে এই এলাকার বিখ্যাত তাঁত কাপড় আর নানারকমের কাঠের জিনিস। লোহা, কাঁচ, অ্যালুমিনিয়াম আর নানা জিনিস দিয়ে তৈরি আসবাব। আছে নতুনগ্রামের পেঁচা, ডোকরা, মাটির তৈরি নানা পুতুল, সরা, হস্তশিল্প।
মেলার কদিন নানা দিবস পালিত হচ্ছে। শ্রমজীবি, অঙ্কন, স্বয়ম্ভরতা, আদিবাসী, প্রাণীসম্পদ, ছাত্র দিবস, কৃষক দিবস থেকে রক্তদান শিবিরে মানুষের ঢল।
বিকেল গড়াতেই মেলায় মানুষের ঢল। কেউ এসেছেন নব্দ্বীপ, কেউ কাটোয়া কেউ বা হুগলি থেকে। সন্ধ্যার আগেই চারটি মঞ্চে দেদার সাংস্কৃতিক সম্ভার। কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখবেন? কোথাও কীর্তণ,কোথাও যাত্রা, কোথাও নাটক, কোথাও লোকনৃত্য। দিনভর চলছে বাউল গান।
মনের সঙ্গে খাবারের যোগ আছে। অসংখ্য স্টল লোকায়ত খাবার থেকে আধুনিক খাবারদাবার নিয়ে হাজির। নবদ্বীপ, কালনা, কাটোয়া থেকে মানুষেরা আসেন। সহজ ভাষায় কৃষির সহজপাঠ এই মেলার অন্যতম থিম।
