ভারতকে পিষে মারতে চেয়েছিলেন হিটলার! সম্ভাব্য নাৎসি বীভৎসতার হাত থেকে রক্ষা পেল কীভাবে ভারত?
নিজস্ব সংবাদদাতা
১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮ : ৪৭
শেয়ার করুন
1
9
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়। ইউরোপ জ্বলছে, নাৎসি জার্মানি গণহত্যায় ব্যস্ত। ঠিক সেই সময়েই অ্যাডলফ হিটলার সন্ধ্যার পর ঘনিষ্ঠ সহচরদের সামনে দীর্ঘ একটানা কথাবার্তা বলতেন। এগুলো কোনও জনসভা বা রেডিও ভাষণ নয়, ডিনার টেবিলে, একান্ত পরিবেশে বলা ব্যক্তিগত মন্তব্য। যুদ্ধের পরে এই কথোপকথনের কিছু অংশ প্রকাশিত হয় Hitler’s Table Talk নামে।
2
9
এই বইয়ে হিটলারের নানা মতামতের মধ্যে রয়েছে ভারতের প্রসঙ্গও। বিশেষ করে বেনারস বা বর্তমান বারাণসীতে গঙ্গার তীরে হিন্দু দাহপ্রথা নিয়ে তার মন্তব্য আজও বিতর্ক তৈরি করে। উদ্ধৃতিটি কেবল আক্রমণাত্মক নয়, বরং নাৎসি মানসিকতার গভীর দিক ফাঁস করে।
3
9
তবে এই বক্তব্যকে সরাসরি ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নেওয়া যায় না। Hitler’s Table Talk কোনও শব্দ-রেকর্ড নয়। হিটলারের কথাগুলো নোট করেছিলেন তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন, হাইনরিখ হাইম ও হেনরি পিকার, অনেক সময় স্মৃতি বা সংক্ষিপ্ত নোটের ভিত্তিতে। পরে সেগুলো সম্পাদিত ও অনূদিত হয়। ফলে ইতিহাসবিদরা এই বইকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করেন। এটি হিটলারের চিন্তাজগৎ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শব্দের নিখুঁত দলিল নয়।
4
9
বইয়ের একটি অংশে দেখা যায়, হিটলার হিন্দু দাহপ্রথা সম্পর্কে পড়া বিবরণের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। গঙ্গায় আধপোড়া দেহ ভাসিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি ঘৃণা প্রকাশ করেন, ধর্মীয় ‘পবিত্রতা’র ধারণাকে বিদ্রূপ করেন এবং দাবি করেন, যদি জার্মানি ভারত শাসন করত, তবে তথাকথিত ‘স্বাস্থ্যবিধি’ বজায় রাখতে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করত। ব্রিটিশ শাসনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা কেবল সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে, আর তাতেই ভারতীয়রা নাকি সৌভাগ্যবান।
5
9
এই মন্তব্য হঠাৎ বলা কোনও কথা নয়। এর ভেতরে নাৎসি মতাদর্শের পরিচিত কাঠামো স্পষ্ট। ইউরোপীয় সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ এবং অ-ইউরোপীয় সমাজকে আদিম ও ‘অপরিষ্কার’ হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল নাৎসি চিন্তার কেন্দ্রে। একই সঙ্গে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রকাশ্য সমালোচনা সত্ত্বেও, হিটলার কঠোর ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণের ধারণায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন।
6
9
এই বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে ‘হাইজিন’ বা পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নাৎসিদের ছদ্ম বৈজ্ঞানিক মোহ। নাৎসি ভাষায় স্বাস্থ্য কখনোই নিরপেক্ষ ছিল না। ‘পরিচ্ছন্নতা’, ‘দূষণ’ আর ‘রোগ’-এর ধারণা ব্যবহার করা হয়েছিল জাতিগত নিধন ও রাষ্ট্রীয় হিংসাকে ন্যায্যতা দিতে। বেনারস প্রসঙ্গে হিটলারের ভাষাতেও সেই একই মানসিকতা ধরা পড়ে, ধর্মীয় আচরণকে কেবল স্যানিটেশনের সমস্যা হিসেবে দেখা।
7
9
অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বারাণসী হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র নগর। গঙ্গার তীরে দাহকর্ম মৃত্যু ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি মোক্ষের বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ প্রশাসক ও মিশনারিরা এই আচারকে প্রায়ই ‘নোংরা’ ও ‘কুসংস্কার’ বলে বর্ণনা করতেন, ধর্মীয় তাৎপর্য ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করে। হিটলারের মন্তব্য সেই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিরই আরও হিংস্র রূপ।
8
9
আজ সোশ্যাল মিডিয়ায় এই উদ্ধৃতি বারবার ফিরে আসে। কারণ এটি চমকপ্রদ, ক্ষোভ জাগায় এবং হিটলারকে শুধু ইউরোপ-কেন্দ্রিক চরিত্র হিসেবে দেখার ধারণা ভেঙে দেয়। কিন্তু প্রেক্ষাপট ছাড়া এই উদ্ধৃতি বিপজ্জনকও হতে পারে। এটি ভারতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। এটি তুলে ধরে ক্ষমতাবান ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে সংস্কৃতি বিচার হয় ‘বৈজ্ঞানিক শৃঙ্খলা’র নামে।
9
9
এই কারণে ইতিহাসবিদরা বলেন, এটি ভারতের বিষয়ে কোনও বক্তব্য নয়। এটি ক্ষমতা কীভাবে সংস্কৃতি সম্পর্কে কথা বলে, তার উদাহরণ। কীভাবে পবিত্র আচারকে ‘পিছিয়ে পড়া’ বলে চিহ্নিত করে, আর সেই তকমার আড়ালে দমন, নিয়ন্ত্রণ ও হিংসাকে যুক্তিসিদ্ধ করা হয়। বেনারস নিয়ে হিটলারের মন্তব্য তাই অতীতের কোনো বিচ্ছিন্ন কৌতূহল নয়। এটি মনে করিয়ে দেয় যখন যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা সবচেয়ে ভয়ংকর রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।