রিয়া পাত্র
ছোট্ট একটা আর্টস স্পেস। ভিতরে জনাকয়েক লোক। সামনে রান্না হচ্ছে। আলো কমছে, বাড়ছে। আলুপোস্ত হয়েছে একটু আগেই। গোবিন্দভোগ চাল ফুটছে। আলু পোস্তর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে সেই গন্ধ। আমি সন্তর্পণে ফোন ব্যাগে ভরে রাখলেও, ভাবছি, মা কি ফোন করল? মা কি ফোন করছে এখন? না করলেও, এক্ষুনি করবে নিশ্চিত! ভাবতে ভাবতেই, মায়ের ফোন আসার আগেই, চট করে লিখছি লেখা। লেখার মাঝেই কিংবা যখন এই লেখাটি আপনাদের কাছে পৌঁছে যাবে, নিশ্চিত থাকুন তার দশ মিনিট আগে হোক কিংবা ঘণ্টাখানেক পর, আমার চৌচির হয়ে যাওয়া স্ক্রিন গার্ডের ভিতর দিয়ে উঁকি মারবে একটি নম্বর। 'মা'। ওই নম্বর থেকে ফোন এলেই, সকাল, দুপুর, রাত, যে কোনও বেলায় প্রথম প্রশ্ন থাকে 'কীরে খেয়েছিস?' না বললে, 'কেন?', 'কখন খাবি?', 'কেন যে সময়ে খাস না!' ইত্যাদি প্রভৃতি। আর হ্যাঁ বললে, 'কী খেলি?'। আমি বাধ্য মেয়ের মতোই মা'কে উত্তর দিই। হ্যাঁ কিংবা না। কাজের চাপে মাঝেসাঝে মিথ্যে বলি। না খেয়ে বানিয়ে বানিয়ে বলি সহজলভ্য কিংবা পছন্দের দু'চারটে খাবারের নাম। যেদিন ক্লান্ত থাকি অসম্ভব, সেদিন সারাদিনের কাজ মিটিয়ে, গরম জলে এক মুঠো গোবিন্দভোগ চাল ফেলে মা'কে ফোন করি। কথা বলতে বলতে ডুমো ডুমো করে আলু কাটি। বাঁকুড়ার মেয়ে। আলু ডুমো করে কাটলেই আগে হাতড়াই পোস্তর প্যাকেট। তারপর একটু কালোজিরে, ক'টা কাঁচালঙ্কা। রান্না শেষের মুখে, ফোনে ধরি মা'কে। মা জিজ্ঞাসা করার আগে, গড়গড় করে বলি, ভাতে-ভাত, আলু পোস্তর কথা। মা শোনেন। আমি মনে করি, ভাতের সুবাস পৌঁছে যাচ্ছে আমার মায়ের ঘরে। মিশে যাচ্ছে আঁচলের সঙ্গে।
সন্ধে সাতটা থেকে সাড়ে আটটা। সন্তোষপুরের অনুচিন্তন আর্ট সেন্টারের ভিতর আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম। যতবার শুনতে পেলাম 'কীরে খেয়েছিস?' আমার সামনে জ্বলজ্বল করে উঠল কপালের লাল টিপ। ছাপা শাড়ির আচলখানি। মনে পড়ল বড় শহরে কাটিয়ে ফেলা এক দশক, স্বপ্নের খাঁজ, আমাদের বদলে বদলে যাওয়া রান্নাঘর আর হাড়ির ফুটন্ত জলে মায়ের একমুঠো গোবিন্দভোগ চাল ফেলে দেওয়া। আর এই গোটা ঘটনা পরপর আমার এবং আমি নিশ্চিত আমার আশেপাশে যে কয়েকজন স্থাণু হয়ে বসে ছিলেন ৯০ মিনিট তাঁদের সকলকেই আমার মতো ঠিক একই জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন মেঘনা এবং তাঁর সঙ্গীরা। সকলের কানে বেজেছে নিশ্চিত 'কীরে খেয়েছিস?'। তাঁরা বুঝিবা অস্ফুটে বলেওছেন 'হ্যাঁ মা'।

এতটা পড়েই ফেলেছেন যখন, বলে রাখা ভাল, নাটকের ব্যাকরণ আমার শিখে ওঠা হয়নি এখনও। কিন্তু মেঘনা রায় চৌধুরীর 'খেয়েছিস' দেখার পর, সামান্য জ্ঞানে যেটুকু বুঝেছি, সেটুকু আর পাঁচজনের সামনে না তুলে ধরতে পারলে, বড় অপরাধ হবে। খেয়েছিস নাটকে ৯০ মিনিট ধরে অভিনয় করেছেন মেঘনা নিজেই। যিনি এই নাটকের কাহিনির রচয়িতা, নাট্যরূপ দিয়েছেন, নির্দেশনাও তাঁর। পর্দার আড়াল থেকেই তাঁকে সঙ্গ দিয়েছেন ধনেশ গোপাল কৃষ্ণন। গল্পের কাহিনি, ভাবনা বিষয়ে ঢোকার আগে, টুক করে বলে রাখা ভাল, এই নাটকের সমগ্র সময় ধরেই, একফালি জায়গায় চরিত্রাভিনেত্রী রান্না করেছেন ফেনা ভাত, আলু পোস্ত। কড়াইয়ে তেল, কালো জিরে আর ক'টা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে গল্পের ছলে গল্পে ঢোকা। প্রবাসী বাঙালি, ভারতের অন্য শহরে বড় হয়ে, আরও বড় স্বপ্ন দেখে, এক সময়ে যান আরও বড় শহরে। বাবা-মা, নিজের নিরাপদ, কমফোর্ট জোন ছেড়ে মেট্রো সিটিতে যেতেই যেন তালগোল পাকিয়ে যায় সব। নিজের স্বপের ড্রামা অ্যাকাডেমি, স্কুলে ড্রামার ক্লাস নেওয়া, মায়ের 'কীরে খেয়েছিস' প্রশ্নের ভিতর দিয়ে জীবন যত এঁকে বেঁকে পেরিয়ে যায়, তত বেশি করে জীবনের পাকদণ্ডীর মাঝে দাঁড়িয়ে একটু একটু করে উঠে আসে বাস্তবতা। নিজের সঙ্গে কথা বলে ক্লান্ত হলে, বাবা'কে হাতড়ান, যতবার বাবাকে হাতড়ান, ততবার ডানা ঝাপটায় কাক। যতবার কাকা উড়ে যায়, ততবার আরও বেশি করে স্বপ্নকে হাতড়ান যুবতী। নাটক, শিল্পের জন্ম দিতে গিয়ে, খালি পেটে দুপুর, বিকেল পার করে রাতে ঢুকে পড়েন তিনি। ততক্ষণে যায় চাকরি। পকেট হয়ে যায় গড়ের মাঠ। জল পৌঁছয় না ঘরে। অটোতে চড়লে যে চুলের গোছা মুখে পড়ে হাওয়ার তোড়ে, সেটুকু বিলাসিতার তালিকায় ঢুকে পড়ে। তবু যন্ত্রবৎ মা'কে বলেন, 'হ্যাঁ মা, খেয়েছি'। একলা শহরে, এক বেলা খাবার খাওয়ার জন্য, দুটো মানুষের সংস্পর্শে আসার জন্য ছুটে যান নাটকের রিহার্সলে। ফিরে আসেন। বঞ্চনা, ষড়যন্ত্রের শিকার হন। চরকির মত দৌড়ে বেড়ান এখান সেখান। কিন্তু তারপর...?
তারপর? তারপর এক সময় যখন সব ধোঁয়াশা লাগে। সব মিথ্যে মনে হয়। সমাজের মুখে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছা করে গোছা গোছা, আর মা যখন জিজ্ঞাসা করেন 'কীরে খেয়েছিস?' তখন কুঁকড়ে গিয়ে, ক্ষোভে, হতাশায়, ক্লান্তিতে ককিয়ে ওঠেন। সর্বস্ব দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, শিল্পের জন্ম দিতে, নিজের স্বপ্নকে ছুঁতে যে পথ তিনি বেছে নিয়েছেন, তার দায় কি মেটাতে হবে পেটের খিদে দিয়ে? এই রাষ্ট্র কি নাগরিকের পেটের জ্বালা মেটাতে সক্ষম নয়? ৯০ মিনিট ধরে, নিজের গল্প এবং নিজের মতো আরও অনেকের গল্প রান্না করতে করতে বছেন মেঘনা নিজেই। যাঁর গলা ভেসে উঠেছে বারে বারে, পর্দার আড়াল থেকে পূর্ণতা দিয়েছেন নাটককে, তিনি ধনেশ গোপাল কৃষ্ণন। নাটকের সাউন্ড ডিজাইন অপারেশন-এর দায়িত্ব সামলেছেন সাগর দাহাড়ে, লাইট অপারেশন-এর দায়িত্ব সামলেছেন উৎকর্ষ বব্বর, লাইট ডিজাইন করেছেন রাহুল রাই। প্রত্যেকে নিজেদের কাজে একশ শতাংশ দিয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই নাটকে রাষ্ট্রের দিকে, সমাজের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার যে সাহস মেঘনা দেখিয়েছেন, তার পিছনে রয়েছে তাঁর নিজের জীবনের গল্পও। পুনে থেকে মুম্বই যাওয়া। নিজের স্বপ্ন ছুঁতে গিয়ে পেটের খিদে, ব্রেখটের খটমটে লেখা, পার্টিশনের পর ঠাকুমার এ দেশে চলে আসা, ফেনাভাত খেয়ে কাটানো দুর্বিসহ দিন নিয়ে এগোতে এগোতেই একসময় দাঁড়ান ব্রেখটের 'Put rolls beside the loaf and leeks beside the cabbage and only
When they added up the bill did I sigh
With my stiff fingers dug into my little purse
And shaking my head confessed that I didn’t have enough
To pay for those few things, and shaking my head I
Left the shop, observed by all the customers.' লাইনগুলির সামনে। বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে প্রশ্ন, নিজের রাস্তা বাছতে গেলে, কেন কাউকে পেটে খিদে নিয়ে, গামছা বেঁধে থাকতে হবে? তাঁর ভুখা পেটে দিন গুজরান করা কি গ্রহণযোগ্য, ভ্যালিড রাষ্ট্রের কাছে? সমাজের কাছে? শিল্পের জন্ম দিতে গিয়ে তাহলে কী পাচ্ছেন শিল্পীরা? ভুখা পেটের যন্ত্রণা আর 'বেঁচে থাকা' শব্দের পাশে স্রেফ প্রশ্ন চিহ্ন? ভাবনা মূলত সেখান থেকেই। বহু গবেষণায় মেঘনা খুঁজে পান বুভুক্ষু মানুষ, পার্টিশন, ফেনাভাত, ক্যাপিটালিজম, পোস্তর যোগসূত্র। খাতা-কলমে সব একে একে লিখতে গিয়ে লিখতে বসে তাঁর কানে বাজে বাবার কথা, মায়ের ফোন কল, ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন। কানে বাজে তাঁর মতো হাজার হাজার স্বপ্ন, শিল্পকে বেছে নেওয়া, চাকরি হারানো, একবেলার খাবার ছাড়া, মেডিক্লেইম ছাড়া, শূন্য পকেটে স্বপ্ন নিয়ে ঘুরতে থাকার বহু বহু মানুষের প্রশ্ন। চোখের সামনে ফাঁকা থালা। চোখের সামনে ফাঁকা মানিব্যাগ। মেঘনা নিজের, নিজের মতো ঘরছাড়া, স্বপ্ন সন্ধানী মানুষদের গলার কাছে দলা পাকানো 'বেঁচে থাকতে চাওয়া'কে একসঙ্গে হাজির করেছেন এই নাটকে।
ওই ঘরছাড়া, স্বপ্নসন্ধানী মানুষগুলো আদতে আমার মতো, মেঘনার মতো, এই যে আপনি, যিনি পড়ছেন, তাঁর মতো। আর ফেনাভাত আর আলুপোস্তর গন্ধ অবিকল আমাদের রান্নাঘরের মতোই। যেখানে দাঁড়িয়ে ডুরে থাকা ছেলেটি বা মেয়েটিকে মা ফোন করে বলেন, 'কীরে খেয়েছিস?'
