নিজস্ব সংবাদদাতা : চলে গেলেন বর্ষীয়ান কবি, সম্পাদক এবং পরিবেশকর্মী কমল চক্রবর্তী। ৩০ অগাস্ট, শুক্রবার জামশেদপুরের এক হাসপাতালে প্রয়াত হলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮০। কয়েকদিন আগে নিজের বাড়িতেই ব্রেন স্ট্রোকের কারণে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। সেই অবস্থায় তাঁকে ভর্তি করা হয় জামশেদপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে। চলে গিয়েছিলেন কোমায়। তারপর এদিন দুপুর ৩টে নাগাদ প্রয়াত হন এই বর্ষীয়ান কবি।

 

তবে শুধুই শিল্পী কিংবা কবি বললে কিছুই বলা হয় না কমল চক্রবর্তীর বিষয়ে। প্রাথমিক পেশায় ছিলেন এক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ার। নয়ের দশকে সে সব ছেড়ে এই অকৃতদার মানুষটি পুরুলিয়ার বান্দোয়ান অঞ্চল থেকে আরও মাইল ১৫ দূরে ঝাড়খণ্ডের সীমানার গাঁ ঘেঁষে বেশ কিছুটা রুক্ষ জায়গা কিনে নেন। কয়েকটি ঘর তৈরি করে শুরু করেন সাঁওতাল যুবক-যুবতী ও তাঁদের  উপজাতীয় সংস্কৃতি রক্ষা করার প্রচেষ্টা। এবং সবুজায়ন করা। প্রতিষ্ঠানটির নাম দেন ভালোপাহাড়। ধীরে ধীরে বিভিন্ন মানুষের পৃষ্ঠপোষকতায় একশো বিঘারও বেশি জমি কেনেন  তিনি এবং পোঁতা শুরু করেন গাছ। যা বর্তমানে একটি নিবিড় বনে পরিণত করেছেন। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ১ লক্ষ ২০ হাজার গাছের লীলাভূমি। কমল চক্রবর্তীর কথায়, ক্ষয়প্রাপ্ত বন ও প্রান্তরের অভদ্রতার মাঝে এটি সবুজের কবিতা”।এরপর তৈরি করেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় যেখানে আজও নিখরচায় পড়াশুনা করে আশেপাশে ২০-৩০টি সাঁওতাল গ্রামের কচিকাঁচারা। সঙ্গে পেট ভরে খাবার। শুধু তাই নয়, বাড়ি থেকে তাদের নিয়ে আসা ও স্কুল শেষে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন এই মানুষটি।

 

শহুরে সভ্যতার কবল থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করার প্রচেষ্টায় বিভিন্ন প্রান্তে দৌড়ে বেরিয়েছেন কমল। ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না। বলতেন, “এই গাছপালাই আমার ঈশ্বর। তাই তো কথায় কথায় হাঁক পেড়ে কিংবা অস্ফুট স্বরে বলে উঠতেন জয় বৃক্ষনাথসঙ্গে নাগাড়ে চলেছে নানা প্রতিষ্ঠিত কাগজ ও প্রকাশনায় কবিতা, উপন্যাস, গল্প লেখা। পাশাপাশি তো ছিলই নিজের তৈরি কৌরব পত্রিকার সম্পাদনা। কমল চক্রবর্তীর ব্যক্তিত্বে ও কর্মকাণ্ড দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সমরেশ মজুমদারের মতো কিংবদন্তি সাহিত্যিকেরা। নিজেদের লেখা একাধিক ছোট গল্প ও উপন্যাসে কমলের কথা তুলে ধরেছিলেন সুনীল-সমরেশ।

 

স্থানীয় মানুষ এবং বিশেষ করে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষেরা তাঁকে ডাকতেন, ‘বুঢ়াবাবা’, ‘দাড়িবাবাবলে। সুখ-দুঃখের কথা, নালিশ এসে জানাতেন কমল চক্রবর্তীর কাছে। শোনা যায়, পুরুলিয়ায় যখন মাওবাদীদের প্রভাব চরমে ওঠে, তখনও কমল চক্রবর্তীর ভালোপাহাড়’-এ তার আঁচ এসে পড়েনি। সাঁঝের আলোয় কিংবা রাত-বিরেতে খাদির ফতুয়া, সস্তা থানের ধুতি পরা কমলের মুখোমুখি হলে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ত মাওবাদীরা। সসম্মানে ছেড়ে দিত তাঁর পথ

 

এই সব গাছগাছালি, ধুলো ভরা পুরুলিয়ার জঙ্গুলে মেঠো পথ এবং তাঁর ‘ভালোপাহাড়’ ছেড়ে শুক্রবার শেষ দুপুরে শেষবার রওনা দিলেন কমল চক্রবর্তী।