আজকাল ওয়েবডেস্ক: দেশজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে 'বন্দেমাতরম' গানের সার্ধ শতবর্ষ। জাতীয় গানের সার্ধ শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে দেশ জুড়ে বছরভর একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। দিল্লির দ্বারকায় কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক দ্বারা আয়োজিত 'লং লিভ ডেমোক্রেসি' নামক একটি অনুষ্ঠানে 'বন্দেমাতরম' গানের উৎসভূমি হিসাবে মুর্শিদাবাদ লালগোলাকেই একপ্রকার স্বীকৃতি দেওয়া হল। কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফ থেকে জারি করা পোস্টারে জানানো হয়েছে 'বন্দেমাতরম' শব্দগুচ্ছ বঙ্কিমচন্দ্র লালগোলাতে বসেই লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে যা তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে ভারতকে স্বাধীন করার জন্য অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কাছে 'বন্দেমাতরম' শব্দ ছিল এক অনুপ্রেরণা। এর অর্থ 'মা তোমাকে বন্দনা করি'। বঙ্কিমচন্দ্রের রচিত এই গান বহু যুগ ধরে অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীকে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। বন্দেমাতরম- এর দেড়শ' বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বছর পর দেশজুড়ে একাধিক কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছেন। 'বন্দেমাতরম' গানটি সঠিক কোন সময়, কোথায় বসে লেখা হয়েছিল এই নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও মুর্শিদাবাদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত থাকার সময় বঙ্কিমচন্দ্র লালগোলার রাজবাড়ির পটভূমিকায় এই গান রাজার অতিথি নিবাসে বসে লিখেছিলেন বলেই বেশিরভাগ লোক মনে করেন।
কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের তরফ থেকে জারি করা পোস্টারে 'বন্দেমাতরম' গানের উৎসভূমি পশ্চিমবঙ্গ মুর্শিদাবাদ শীর্ষক একটি পোস্টারে লেখা হয়েছে- ১৮৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বহরমপুরের ব্যারাক স্কোয়ার ময়দানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের একটি বড় অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছিল। ওই সময় ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্ট-এর মধ্যে একটি ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন কর্নেল ডাফিন তাঁকে হেনস্থা করেছিলেন। ব্রিটিশ কর্নেলের এই অপমান নীরবে সহ্য করার পরিবর্তে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়তে নামেন,যা সেই সময় বহু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
সেখানে আরও লেখা হয়েছে, ব্রিটিশদের সঙ্গে চলা উত্তেজনায় এবং হুমকির মুখে বঙ্কিমচন্দ্রকে লালগোলার তৎকালীন রাজা রাও যোগীন্দ্র নারায়ণ রায় লালগোলায় থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এটা মনে করা হয় লালগোলার আধ্যাত্বিক ভক্তিপূর্ণ মন্দির পরিবেষ্টিত পরিবেশে থাকার সময় বঙ্কিমচন্দ্র 'বন্দেমাতরম' শব্দগুচ্ছ রচনা করেন। যা পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ-এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। এই 'বন্দেমাতরম' শব্দই পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও দেশাত্মবোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায়, ১৮৭৩ সালে বহরমপুর শহরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে কর্নেল ডাফিনের যে গন্ডগোল হয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে কোর্টের রায়ে ১৮৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি কর্নেলকে প্রকাশ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের হয়ে এই মামলায় প্রধান সাক্ষী ছিলেন লালগোলার মহারাজ রাও যোগেন্দ্র নারায়ন রায়।
'বন্দেমাতরম ও আনন্দমঠ-এর উৎসভূমি লালগোলা' গ্রন্থের লেখক সুমন কুমার মিত্র জানান, এই ঘটনার কিছুদিন আগে থেকে ম্যালেরিয়ার কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের স্বাস্থ্য ভেঙে যাচ্ছিল। তাই তিনি সরকারের কাছে ছুটির দরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন মঞ্জুর না হওয়া সত্ত্বেও লালগোলার মহারাজের আমন্ত্রণের সাড়া দিয়ে জানুয়ারি মাসে তিনি লালগোলায় চলে আসেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই লালগোলার রাজবাড়ী এবং কলকলি নদীর প্রেক্ষাপটে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত 'বন্দেমাতরাম' গানের 'বন্দে মাতরম্ সুজলাং সুফলাং থেকে রিপুদলবারিণীং মাতরম্' পর্যন্ত অংশটি লিখেছিলেন।' বহু ঐতিহাসিক বলেন, লালগোলা রাজবাড়িতে থাকাকালীন বঙ্কিমচন্দ্র কালীবাড়িতে ঢুকে ডান দিকের দোতলার একটি ছোট ঘরে বসে লেখালিখি করতেন। বর্তমানে ওই ঘরের ভেতরের অংশ ভেঙে পড়েছে। সিড়িও ভেঙে পড়েছে।
লেখক সুমন কুমার মিত্র ঐতিহাসিক সূত্র হিসাবে গ্রহণ করে বন্দেমাতরম্ সঙ্গীতের রচনাস্থল হিসাবে মুর্শিদাবাদের লালগোলাকে উপস্থাপনের জন্য ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন ,"সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বন্দেমাতরম্ সঙ্গীত লালগোলায় শৃঙ্খলিত কালীমন্দিরে বসে লেখেন এবং আনন্দমঠ উপন্যাসের পটভূমি এই লালগোলার বিভিন্ন ক্ষেত্র তা আমার গবেষণায় ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র সহ প্রমাণিত। ভারত সরকারের মান্যতা আমাদের দাবী ও গবেষণাকে আরও শক্ত ভীতে স্থাপন করল। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে যাঁরা যাঁরা আমার এই গবেষণায় নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান করলেন সকলের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রইল।"
মুর্শিদাবাদ জেলা ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রের সম্পাদক অরিন্দম রায় বলেন ,"বিস্তর গবেষণা ,অনুসন্ধান এবং সমীক্ষা করে পূর্ণাঙ্গ গবেষণামূলক গ্রন্থ 'বন্দেমাতরম ও আনন্দমঠ-এর উৎসভূমি লালগোলা' প্রকাশ করে 'মুর্শিদাবাদ জেলায় ইতিহাস ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র'। তারপর থেকেই বন্দেমাতরম্ সঙ্গীতের রচনা স্থান হিসেবে মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলার বিষয়টি, বাংলা এমনকি সর্বভারতীয় স্তরে গুরুত্ব পেতে শুরু করে বিভিন্ন মহলে। বন্দেমাতরম সঙ্গীতের সঙ্গে লালগোলা জনপদের যোগসূত্র নিয়ে জাতীয় স্তরেও শুরু হয়ে যায় চর্চা। অবশেষে ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক তাদের ওয়েবসাইটে এবং দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে বন্দেমাতরম সঙ্গীতের সঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলা তথা লালগোলার যুগসূত্রের বিষয়টিকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার আমরা সকলেই খুব উৎসাহিত বোধ করছি।















