রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ (ইউসিসি) চালুর তোড়জোড় শুরু হতেই বাংলার রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। উত্তরাখণ্ড, গুজরাট এবং অসমের পর এবার চতুর্থ রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এই আইন কার্যকর করার পথে হাঁটছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
2
10
শাসক দল বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহারে এই প্রতিশ্রুতি আগেই ছিল, আর এবার সেই লক্ষ্যেই নবান্ন ও আইন দপ্তর তাদের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করে ফেলেছে বলে খবর। জানা যাচ্ছে, আগামী সোমবার বিধানসভায় এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরবেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই এই আইন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনই শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র চাপানউতোর।
3
10
আসলে এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বলতে বোঝায় এমন এক আইনি ব্যবস্থা, যেখানে ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে দেশের সমস্ত নাগরিকের জন্য বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার এবং দত্তক নেওয়ার মতো সামাজিক বিষয়গুলো একটিমাত্র নিয়মের অধীনে চলে আসবে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মের নিজস্ব ব্যক্তিগত আইন বা 'পার্সোনাল ল' চালু রয়েছে।
4
10
নতুন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে সেই আলাদা নিয়মগুলো রদ হয়ে সবার জন্য একটাই অভিন্ন দেওয়ানি আইন প্রযোজ্য হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী অধিকার রক্ষা এবং সমাজে লিঙ্গ-সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
5
10
বাংলায় এই আইনটি কার্যকর করার জন্য মূলত ‘অসম মডেল’কে বেছে নেওয়া হচ্ছে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। এই খসড়া প্রস্তাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বদলের কথা বলা হয়েছে। যেমন, যেকোনও বিয়ের পর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তার সরকারি রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একই সাথে পুরোপুরি নিষিদ্ধ হতে চলেছে বহুবিবাহ প্রথা; এই নিয়ম ভাঙলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
6
10
বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও আইনি নথিভুক্তিকরণ জরুরি করা হচ্ছে এবং কেউ যদি লিভ-ইন সম্পর্কে থাকেন, তবে সেই যুগলকেও নিজেদের সম্পর্কের কথা সরকারিভাবে নথিভুক্ত করতে হবে। এছাড়া, পরিবারে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সম্পত্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিয়ের ন্যূনতম বয়স মেয়েদের জন্য ১৮ এবং ছেলেদের জন্য ২১ বছর রাখার কথা বলা হয়েছে।
7
10
তবে অসমের মতোই বাংলার ক্ষেত্রেও আদিবাসী বা তপশিলি উপজাতিভুক্ত সমাজকে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হচ্ছে, যাতে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও প্রথাগত রীতিনীতিতে কোনও আঘাত না লাগে।
8
10
এই আইনকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির দুই প্রধান মেরু ইতিমধ্যেই একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছে। বিজেপির প্রবীণ নেতা দিলীপ ঘোষ সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, এর মাধ্যমে রাজ্যের সমস্ত নাগরিকের জন্য সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হচ্ছে। সমাজের অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া অংশকে প্রয়োজনে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলেও, আইনের চোখে সবাই যাতে এক সারিতে দাঁড়াতে পারে, সেটাই তাদের লক্ষ্য।
9
10
অন্য দিকে, প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই আইনের তীব্র বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কালীঘাটের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর দলের প্রবীণ সাংসদ সৌগত রায় সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিধানসভায় এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তারা জোরালো সওয়াল করবেন। তাঁর মতে, আমাদের বৈচিত্র্যময় সমাজে এই ধরনের আইনের কোনও বাস্তব প্রয়োজনীয়তা নেই।
10
10
বিরোধীদের অভিযোগ, এই আইনের আড়ালে আসলে সংখ্যালঘুদের নিশানা করার এবং তাদের প্রতি এক ধরনের বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করার চেষ্টা চালাচ্ছে শাসক দল। সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই বিধি কার্যকর করা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক কোনও বিষয় নয়। ফলে সোমবার বিধানসভার অধিবেশন যে বেশ উত্তপ্ত হতে চলেছে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।