পাসপোর্ট কি কেবলই বিদেশ ভ্রমণের ছাড়পত্র, নাকি এটি দেশের নাগরিকত্বেরও চূড়ান্ত দলিল? এতদিন সাধারণ মানুষের মনে এই নিয়ে কোনও সংশয় না থাকলেও, সম্প্রতি বিদেশ মন্ত্রকের এক পদস্থ কর্তার একটি মন্তব্য দেশজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
2
10
গত ২৪ জুন পাসপোর্ট সেবা দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট জানান, পাসপোর্ট আসলে একটি ভ্রমণ-নথি বা ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’, একে কোনোভাবেই নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিদেশে থাকার সময় এটি হয়তো ব্যক্তির জাতীয়তা বা ন্যাশনালিটিকে তুলে ধরে, কিন্তু দেশের ভেতরে নাগরিক অধিকার প্রমাণের আইনি ভিত্তি এর নেই।
3
10
এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে শোরগোল পড়ে গেছে। বিরোধী শিবিরের নেতারা প্রশ্ন তুলছেন, কড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পর যে পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তা যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ না হয়, তবে আমজনতা নিজেদের নাগরিক প্রমাণ করতে কোন নথি দেখাবে?
4
10
ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের কাজ চলার এই সময়ে প্রশাসনের এমন অবস্থানে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজ্যসভার সাংসদ কপিল সিব্বল। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দাবি করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তবে কি সাধারণ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হবে? অন্যদিকে এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এবং বিশিষ্ট গীতিকার জাভেদ আখতারও বিষয়টিকে অত্যন্ত অযৌক্তিক বলে তীব্র কটাক্ষ করেছেন।
5
10
বিতর্ক ধামাচাপা দিতে ২৫ জুন কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনের একটি বিশেষ ধারার উল্লেখ করে জানানো হয়, জনস্বার্থে সরকার চাইলে ভারতীয় নাগরিক নন এমন ব্যক্তিকেও পাসপোর্ট দিতে পারে। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, তাহলে এ দেশে নাগরিকত্ব নির্ধারণের আসল উপায় কী?
6
10
আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও একটি নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র দিয়ে ভারতের নাগরিকত্ব প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, মূলত পাঁচভাবে এ দেশের নাগরিক হওয়া যায়— যার মধ্যে অন্যতম হল জন্মসূত্র ও বংশানুক্রম। যেমন, ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে ভারতে জন্মানো যেকোনও ব্যক্তিই জন্মসূত্রে এ দেশের নাগরিক।
7
10
আবার দেশের বাইরে জন্ম হলেও বাবা-মায়ের সূত্রে কিংবা টানা ১২ বছর এ দেশে বসবাসের পর প্রাকৃতিক নিয়মে নাগরিকত্ব পাওয়া সম্ভব।
8
10
এই পুরো বিতর্কটি নাগরিকত্ব (সিটিজেনশিপ) ও জাতিসত্তার (ন্যাশনালিটি) মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটিকেও সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয়তা বা জাতিসত্তা হল মানুষের জন্ম ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত এক চিরন্তন পরিচয়, যা কখনও বদলানো যায় না। যেমন, কোনও ভারতীয় যদি আমেরিকার নাগরিকত্বও নেন, তবুও জাতিসত্তার দিক থেকে তিনি ভারতীয়ই থাকবেন।
9
10
অন্যদিকে, নাগরিকত্ব হল রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির একটি সুনির্দিষ্ট আইনি চুক্তি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গাইডলাইন বলছে, আমরা দৈনন্দিন জীবনে যে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করি, সেগুলি আসলে আমাদের বাসস্থানের প্রমাণপত্র, নাগরিকত্বের চূড়ান্ত দলিল নয়।
10
10
ফলে পাসপোর্টের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ নথিকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই আইনি ও রাজনৈতিক ধোঁয়াশা সাধারণ মানুষকে এক গভীর উদ্বেগের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।