আজকাল ওয়েবডেস্ক: ম-এ মোহনবাগান। এই শব্দগুলোই ছিল টুটু বোসের জীবনদর্শন। 
রসিকতা করেই বলতেন, “আমারও ম-এর দোষ আছে।'' সেই ‘ম’-এ মোহনবাগান। কিন্তু যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানতেন, এটা নিছক রসিকতা নয়, এটাই ছিল গভীর বাস্তব। 

 

মোহনবাগান তাঁর রক্তে। তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাসে। তাঁর হৃদয়ে। 

 

আজ বুধবার সকালে যখন তাঁর নশ্বর দেহ মোহনবাগান ক্লাবে পৌঁছল, তখন যেন সবুজ-মেরুন তাঁবুর প্রতিটা কোণে এক অদ্ভুত নিস্তবদ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। নিঃশব্দেরও ভাষা আছে। তা পড়লেই বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। এতদিন যে মন্দিরের তিনি যজ্ঞের পুরোহিত ছিলেন, যা ছিল তাঁর প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ সেই মানুষটাই আজ ক্লাবতাঁবুতে পা রাখলেন শেষবারের মতো। 

 

ফুলে ঢাকা শরীর নিশ্চুপ, অথচ চারপাশে যেন অনুরণিত হচ্ছে প্রাণখোলা হাসি। কোথাও যেন অস্ফুটে বেজে চলেছে রবিঠাকুরের সেই গান, 'যেখান দিয়ে হেসে গেছে,  হাসি তার রেখে গেছে'।  তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে ক্লাব লন পূর্ণ। তাঁবুর ভিতরে ভিড়। দূরের ওই ক্যান্টিনের সামনে জটলা। 

দিন শেষ হয়ে আসছে, সূর্য অস্তমিত হতে চলেছে, এমন দিনের আভাস কি মানুষ আগে থেকে আঁচ করতে পারে? হয়তো তাই, হয়তো নয়। নইলে গত বছরের ২৯ জুলাই নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের সেই সন্ধেতে কেন তিনি 'মোহনবাগান রত্ন' সম্মান হাতে নিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেলবেন? 

 

বাকরুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ''এটা হাতে পেয়ে মনে হচ্ছে আমি আকাশের চাঁদ পেয়েছি।'' 

 

সেই মঞ্চেই যেন অদ্ভুত এক বিদায়বার্তা রেখে গিয়েছিলেন। হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, ''আমি মারা যাওয়ার পর মোহনবাগান ক্যান্টিনটা আমার নামে করে দিস।'' 

 

স্টু-পাউরুটির গন্ধ মাখা সেই ক্যান্টিনে জড়িয়ে ছিল তাঁর অসংখ্য স্মৃতি, অসংখ্য বিকেল।

 

তারপর সেই কথাগুলো--স্মৃতির ভাঁজে জড়িয়ে থাকা তাঁর মন্তব্য রিওয়াইন্ড করলে মনে হয় সত্যিই তো তিনি হয়তো আগাম আন্দাজ করতে পেরেছিলেন মৃত্যুকে। বলেছিলেন, ''“শরীরটা ভেঙে যাচ্ছে। হয়তো আর তোদের সঙ্গে আমার দেখা হবে না…।'' 

 

হৃদয় হু হু করে ওঠে সেই মন্তব্য শুনলে। আজীবন তিনি ভেবে গিয়েছেন মোহনবাগানের কথা। তাই তো বলেছিলেন, '' এবার ১৯টা লাইফ মেম্বার হয়েছে। আমি চাই ২০টা হোক। আর সেই ২০ নম্বর লাইফ মেম্বার যেন পরজন্মে টুটু বোস হয়।'' 

 

কে বলে এমন ভালবাসা শুধু সমর্থন! এ এক আজীবনের আত্মসমর্পণ বললেও অত্যুক্তি করা হবে না।

 

মোহনবাগান বিশ্বের কাছে টুটু বোস ছিলেন এক অনুভূতির নাম। আজ তিনি নেই, অথচ তিনি আছেন। আছেন রবিঠাকুরের সেই গভীর বাণীর মতো। 

 

মোহনবাগান তাঁবুর প্রতিটি ইট, কংক্রিটের গ্যালারি, ক্যান্টিনের উনুনে ঝলসে ওঠা পাউরুটি আর স্টু এখনও তাঁর গল্প বলে চলে।


কিছু মানুষ চলে গিয়েও থেকে যান।
টুটু বসুও ঠিক তেমনই থেকে যাবেন, সবুজ-মেরুন পতাকার ভাঁজে, গ্যালারির আবেগে, ক্লাবের প্রতিটি মুহূর্তে। 
কোথাও না কোথাও অনুরণিত হবে সেই চিরচেনা গলা, ''ম-এ মোহনবাগান।''

&t=1s