সম্পূর্ণা চক্রবর্তী: আবেগের জনসমুদ্র। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। অস্কারকে আকুতি। এরই অপর নাম হয়ত ইস্টবেঙ্গল। ২২ বছরের খরা কাটিয়ে সর্বভারতীয় লিগ ঢুকেছে লাল হলুদ তাঁবুতে। সেই দৃষ্টান্ত রেখে দিল ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা। ঐতিহাসিক সাফল্যের জনসমুদ্রে ভাসল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব চত্বর। বাচ্চা থেকে বুড়ো, বাদ নেই কেউই। যেমন ছিলেন বসিরহাটের ৭৭ বছরের বৃদ্ধা কল্পনা চক্রবর্তী, তেমনই ছিলেন কোলের শিশুও। শুধুমাত্র ইস্টবেঙ্গলের উৎসবের অঙ্গ হতে গাড়ি নিয়ে জামাই অশোক ব্যানার্জি এবং পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে হাজির লাল হলুদ তাঁবুতে। অনুষ্ঠান শেষে আবার বসিরহাট ফিরে যাবেন। অন্যদিকে হয়ত সবে মাত্র কথা বলতে শিখেছে, তারমধ্যেই বাবার সঙ্গে উৎসবে হাজির বছর দুয়েকের শিশু। মুখে একটাই বুলি, 'জয় ইস্টবেঙ্গল।' একেই বলে আবেগ। যা ফুটবল মাঠেই পাওয়া যায়। অবশেষে দুই যুগের অপেক্ষার অবসান। তাই এইটুকু স্পর্ধা দেখাতেই পারে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা। এদিন সাপোর্টারদের জন্য অগাধ প্রবেশ ছিল। জয়ের স্বাদ নিতে সমর্থকের ঢল নামে।
দুপুরের চড়া রোদ, গরমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উৎসবে মাতোয়ারা সকলে। মাঝের বছরগুলোতে কি একেবারেই সাফল্য পায়নি ইস্টবেঙ্গল? তেমন ঠিক না। ফেডারেশন কাপ, সুপার কাপ জিতেছে। কিন্তু আসেনি লিগ। অধরা আই লিগও। একাধিকবার তীরে এসে তরী ডোবার উদাহরণ রয়েছে। আইএসএলে প্রতিবারই টেবিলের তলানিতে। ভারত সেরা হওয়ার স্বপ্নপূরণ কোনওদিন হয়নি। সেখান থেকে এবার লিগের ফার্স্টবয়। সেই কারণেই হয়ত আবেগের স্রোতে ভাসে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা।

উন্মাদনা ছিল দেখার মতো। বিকেল সাড়ে চারটেয় ছিল মূল অনুষ্ঠান। ফুটবলারদের ক্লাবে প্রবেশ করার কথা ছিল দুপুর সাড়ে তিনটের সময়। তার প্রায় এক ঘণ্টা আগে থেকেই ক্লাব প্রাঙ্গণে মানুষের ঢল। তারমধ্যে অধিকাংশই লাল হলুদ জার্সিতে। কারোর হাতে পতাকা, কারোর মাথায় লাল হলুদ ব্যান্ড। ক্লাবের বাইরে এরিয়ানের গেটের সামনে বিক্রি হচ্ছিল চ্যাম্পিয়ন লেখা জার্সি, পতাকা, ব্যাচ। মুহূর্তের মধ্যেই নিঃশেষ।
চত্বরে পা রাখা মাত্র কানে আসে দুটি শব্দ, 'জয় ইস্টবেঙ্গল'। শুধু একবার নয়, একাধিকবার। স্লোগানে এবং লাল হলুদ আবিরে জয়গাথা রচনা হয়। পতাকা উত্তোলন দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হওয়ার কথা ছিল। অনেক আগে থেকেই ক্লাব লনের বাইরে ভিড় জমায় সমর্থকরা। তাঁদের তাতিয়ে দেন ডার্বির নায়ক এডমুন্ড লালরিনডিকা। সমর্থকদের সঙ্গে পালা করে সেলফি তোলেন। তারপর পতাকা উত্তোলন। ছিলেন ক্লাব এবং ইমামির কর্তারা। ইমামির পক্ষ থেকে ছিলেন আদিত্য আগরওয়াল, মণীশ গোয়েঙ্কা, বিভাস আগরওয়াল এবং সন্দীপ আগরওয়াল। ক্লাবের সভাপতি মুরারি লাল লোহিয়া, শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার, সচিব রূপক সাহা, কোচ অস্কার ব্রুজোর হাতে হয় পতাকা উত্তোলন। ছিলেন প্রাক্তন সচিব কল্যাণ মজুমদার, শান্তিরঞ্জন দাশগুপ্ত সহ একাল এবং সেকালের ইস্টবেঙ্গল কর্তারা। এছাড়াও ছিলেন প্রাক্তন ফুটবলাররা। এই তালিকায় ছিলেন ভিক্টর অমলরাজ, বিকাশ পাঁজি, প্রশান্ত ভট্টাচার্য, প্রশান্ত চক্রবর্তী, মাধব দাস প্রমুখ। তারই মাঝে 'স্টে অস্কার' পোস্টার হাতে দেখা যায় সমর্থকদের।
ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যে সামিল হতে ক্লাবে ছুটে আসেন সিপিএম নেত্রী দীপ্সিতা ধর। পতাকা উত্তোলনের আগেই প্রবেশ করেন ক্লাবে। লাল হলুদ আবির মেখে মহিলা সমর্থকদের সঙ্গে কোমর দোলাতে দেখা যায় তাঁকে। তবে এদিন প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কোচ এবং ফুটবলাররা। রশিদ থেকে আনোয়ার, সবার উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। সমর্থকদের সঙ্গে উৎসবে সামিল হন দেশি থেকে বিদেশি প্লেয়াররা। এজ্জেজারি, মিগুয়েলরাও সমানতালে সেলিব্রেশনে অংশ নেন। আগের দিন ম্যাচের পর সমর্থকরা মাঠ দখল করে নেওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্টবেঙ্গলের বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এদিন ফেডারেশন সভাপতি কল্যাণ চৌবের উপস্থিতিতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। ছিলেন ইস্টবেঙ্গল এবং ইমামির কর্তারাও। কিশোর ভারতীর মতো ইস্টবেঙ্গল মাঠেও তৈরি করা হয় পোডিয়াম। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হতে কিছুটা দেরী হলেও, হয় সুষ্ঠুভাবে।
পুরো পরিকল্পনা মাফিক অনুষ্ঠান। সমর্থকদের জন্য এক পাশের গ্যালারি ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রায় হাজার পাঁচেক সমর্থক উপস্থিত ছিল। মোতায়েন ছিল পুলিশ। যার ফলে আগের দিনের কিশোর ভারতীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেনি। পুরো উৎসবের মেজাজে ছিল ফুটবলাররা।

ভাঙরা নাচে মাতেন প্রভসুখন গিল এবং আনোয়ার আলি। তাঁদের যোগ দেন সল ক্রেসপোও। এমনকী ইস্টবেঙ্গলের শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকারকে নাচানোর চেষ্টা করেন সৌভিক, আনোয়ার এবং গিল। কিন্তু সফল হয়নি। এডমুন্ড, ডেভিড, নন্দকুমাররা ছিল মেজাজে। পালা করে ট্রফি নিয়ে ফটোসেশন চলে। তাতে সামিল হন অস্কারও। পরের মরশুমে তাঁকে লাল হলুদের হটসিটে দেখা যাবে কিনা জানা নেই। তবে গ্যালারি থেকে থাকার আকুতি পেলেন।
আইএসএলের পাশাপাশি কন্যাশ্রী কাপেও চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল। একইসঙ্গে ছেলেদের এবং মেয়েদের ফুটবলে সাফল্য। তাই অস্কার ব্রুজো এবং অ্যান্টনি অ্যান্ড্রুজকে নিয়ে হয় আলাদা ফটোসেশন।

ইস্টবেঙ্গলে এদিন আবেগ এবং উন্মাদনা মিলেমিশে একাকার। শুধুমাত্র কোচ এবং ফুটবলারদের নয়, ট্রফি সমর্থকদেরও। গত দু'দিনের সেলিব্রেশনে যেন তারই প্রতিফলন। মাঠে টানা গান চলে। অরিজিৎ সিংয়ের গাওয়া ইস্টবেঙ্গলের থিম সং 'জার্সি আমার মা, আর কিছুই জানি না..' থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা গান বাজে। সেই তালে মাতেন ফুটবলার থেকে সমর্থক। গিল, আনোয়ারের পাশাপাশি বাংলা, হিন্দি গানের সঙ্গে সমানতালে নাচেন অ্যান্টন, সিবিলেও। কোমর দোলান রশিদও। ছিল না কোনও বিভেদ। সবাই একই পরিবারের অঙ্গ। ২২ বছর পর স্পর্ধা দেখানোর সুযোগ পেয়েছে লাল হলুদ সমর্থকরা। মন-প্রাণ একেবারে উজাড় করে দেয়। লেখে নতুন ইতিহাস। অতীতে কলকাতা ময়দান অনেক সেলিব্রেশন দেখেছে। ভবিষ্যতে আরও দেখবে। তবে ইস্টবেঙ্গলের আইএসএল জয়ের উৎসব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।















