সম্পূর্ণা চক্রবর্তী: যেদিকে চোখ যায়, সেদিকে লাল হলুদ। কিশোর ভারতীর সবুজ গালিচা পুরো লালে লাল। রাজ্যের পালা বদলে বদলে গিয়েছে আইএসএলের রং। গত দু'বছর দেশের একনম্বর লিগের রং ছিল সবুজ মেরুন। আজ সেটা বদলে লাল হলুদ। ফুটবলার, কোচদের তো বটেই, এই ট্রফি সমর্থকদের । যার সেলিব্রেশন ছিল অনবদ্য। মনে করিয়ে দিল বিদেশি ক্লাবগুলোর সেলিব্রেশনকে। ২২ বছর পর সর্বভারতীয় ট্রফি জয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করল ইস্টবেঙ্গল ক্লাব। ম্যাচ শেষে গ্যালারিতে জ্বলে মশাল। তার খনিকের মধ্যে গোটা গ্যালারি মাঠে। এদিন আট হাজার দর্শক কিশোর ভারতী ভরিয়েছিল। ২২ বছরের অপেক্ষার অবসানের পর আর তর সয়নি। প্রথমে গ্যালারি টপকে, তারপর গেট ভেঙে মাঠে প্রবেশ করে সমর্থকরা। 

সবে ম্যাচ শেষ হয়েছে। মাঠে তখনও হাজির কোচ অস্কার ব্রুজো এবং ফুটবলাররা। ইউসেফ এজ্জেজারি এবং প্রভসুখন গিলকে কাঁধে তুলে নেয় সমর্থকরা। লাল হলুদ আবিরে রাঙিয়ে দেওয়া হয় এজ্জেজারি, মিগুয়েলদের। অস্কার ততক্ষণে তাঁর কোচিং স্টাফে পরিবেষ্টিত। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকে ছয়লাপ মাঠ। এই অবস্থায় প্লেয়ারদের বেশিক্ষণ মাঠে রাখার ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। ট্রফি দেওয়ার কথা ছিল মাঠে। পরিকল্পনা মাফিক বসানো হয় মঞ্চও। উপস্থিত ছিলেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কল্যাণ চৌবে। একাধিকবার সমর্থকদের মাঠ খালি করার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু লাভ হয়নি। ২২ বছর পর অর্জন করা এই স্পর্ধার কাছে হার মানে আয়োজক থেকে পুলিশ। র‍্যাফ নামানো হয়, হালকা লাঠিচার্জও হয়। কিন্তু মাঠ খালি করা সম্ভব হয়নি। কিশোর ভারতীর দখল নিয়ে নেয় ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা। অগত্যা বদলাতে হয় পরিকল্পনা। 

মাঠের বদলে ইস্টবেঙ্গল কোচ এবং ফুটবলারদের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয় ভিআইপি বক্সের গ্যালারিতে। গোল্ডেন বুট পান ইউসেফ এজ্জেজারি। মাঠে দাঁড়িয়ে যার সাক্ষী থাকে সমর্থকরা। এক অদ্ভুত পরিবেশ। না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্য স্মরণীয় মুহূর্ত। ঢাক-ঢোল, বাজি, আবিরে স্বর্গীয় পরিবেশ। এর আগেও একাধিক দল আইএসএল জিতেছে, কিন্তু এই মাত্রায় সেলিব্রেশন চোখে পড়েনি। গ্যালারিতে গায়ে প্যালেস্তাইনের পতাকা জড়িয়ে সেলিব্রেট করতে দেখা যায় রশিদকে। সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রফি হাতে হাসিমুখে পোজ দেন লাল হলুদের মাঝমাঠের কান্ডারী। পরে প্যালেস্তাইন প্রসঙ্গ উঠতেই জানান, প্যালেস্তাইনের নাগরিক হিসেবে খেলা, এই জায়গায় পৌঁছনো সহজ নয়। তাই তিনি গর্বিত। রশিদ বলেন, 'প্যালেস্তাইনের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত। প্যালেস্তাইনের মানুষের জন্য জীবন যথেষ্ঠ কঠিন। এই যাত্রাপথ সহজ নয়। এই জায়গায় পৌঁছতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। তাই প্যালেস্তাইনের নাগরিক হয়ে আমি গর্বিত। আমার বন্ধুদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ওরা সদ্য ইজিপশিয়ান লিগ, রোমানিয়ার লিগ জিতেছে। ওখানে প্যালেস্তাইনের অনেক ফুটবলার খেলে। তাই আমি খুশি এবং গর্বিত।' 

জয়সূচক গোল করে সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটান রশিদ। ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা দাবি করেন, শুরু থেকেই তাঁদের মাথায় টার্গেট ছিল। রশিদ বলেন, 'আমাদের মাথায় বরাবর টার্গেট ছিল। আমরা নিস্তব্ধে কাজ করায় বিশ্বাসী। নীচে থেকে ওপরে ওঠা ভাল। সেই সাফল্যের আনন্দ আলাদা।' রশিদ জানান, এটাই তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল। দাবি করেন, খেতাব জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। রশিদ বলেন, 'আমার ফুটবল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোল। আইএসএলের শুরু থেকে অনেক গোল মিস করেছি। ক্রসবারে লেগেছে। তবে এদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আমার মনে হয়েছিল, আমরাই চ্যাম্পিয়ন হব।' এই সাফল্য প্রয়াত বাবাকে উৎসর্য করেন রশিদ। আইএসএল জেতার পর ভিআইপি গ্যালারিতেই চলে পালা করে সেলিব্রেশন। ইস্টবেঙ্গলের প্রত্যেক ফুটবলারের হাতে ট্রফি ঘোরে। চলে ফটোসেশন। সবার হাত ঘুরে প্রায় শেষে পান অস্কার। মাঠে তখন লাল হলুদ প্লাবন। সবাই উৎসবমুখর। গ্যালারিতে পড়ে পোস্টার। তাতে লেখা, 'অ্যা থাউস্যান্ড স্কার্স, ওয়ান ইমোর্টাল ক্রাউন।' এদিন সেলিব্রেশনের মাঝেই অস্কারকে ইস্টবেঙ্গল কোচের হটসিটে থেকে যাওয়ার আর্জি জানায় সমর্থকরা।