অয়ন মুখোপাধ্যায় 

আমরা বাঙালিরা সাধারণত দু’টি জিনিস নিয়ে খুব আসক্ত এবং বিতর্কহীন —প্রথমত, ফেলুদাকে পড়া, আর দ্বিতীয়ত, অতীতে আমরা কী কী করেছিলাম তাই নিয়ে চায়ের দোকানে বসে ট্র্যাফিক জ্যাম করা। আমাদের এই যৌথ নস্টালজিয়ার গুদামে বেশ কিছু অবিসংবাদিত মালপত্র আছে, যার মধ্যে অন্যতম হল ১৯৮৩ সালের ২৫ জুন। ওই দিন লর্ডসের মাঠে যা ঘটেছিল, তা নিয়ে আমরা গত ৪৩ বছর ধরে এতো পরিমাণ রোমন্থন করেছি যে, খোদ কপিল দেবের দলও বোধহয় মাঝে মাঝে ভাবেন—"ভাই, আমরা কি সত্যিই বিশ্বকাপ জিতেছিলাম, নাকি কোনও আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটিয়েছিলাম?" কিন্তু রসিকতা সরিয়ে রেখে যদি আমরা একটু গভীরে যাই বা ঘটনাটাকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখবেন, সেদিনের সেই ১৮৩ রানের পুঁজি নিয়ে ডিফেন্ড করাটা স্রেফ একটা ক্রিকেট ম্যাচ ছিল না। ওটা ছিল আসলে একটা গোটা দেশের ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স বা হীনম্মন্যতার গালে কষে একটা থাপ্পড় ।

আসলে ইতিহাস কোনও আকস্মিক দুর্ঘটনা হিসেবে আমাদের উপস্থিত হয় না। বরং তার মধ্যে থাকে একটা দীর্ঘদিনের পূর্বপ্রস্তুতি। তাই ঘটনাচক্রে ইতিহাসের নির্মাণও ঘটে অদম্য জেদ আর সঠিক মুহূর্তের এক অমোঘ সদ্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে। ১৯৮৩ সালের ২৫ জুনের লর্ডস ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে সেই রকমই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ১৯৮৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের ঘটনাকে আপনি যদি কেবলই একটা ক্রিকেট ম্যাচের ফাইনাল হিসেবে দেখেন, তবে আপনি লর্ডসের সবুজ ঘাসে লুকিয়ে থাকা ঔপনিবেশিক রাজনীতির গন্ধটা মিস করবেন।

সেদিন লন্ডনের সেন্ট জনস উডের সেন্ট্রাল ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে কোনও ভারতীয় বুক ঠুকে বলতে পারেননি, "আজ আমরা জিতব।" বাজি বাজারের দর ছিল ভারতের বিপক্ষে ১:৬৬। খোদ লর্ডসের অফিশিয়ালরা ধরে নিয়েছিলেন ক্লাইভ লয়েডের ওয়েস্ট ইন্ডিজ হ্যাটট্রিক করতে চলেছে। ম্যাচের পর শ্যাম্পেনের বোতলগুলো কোন ড্রেসিংরুমে যাবে, তাও অলিখিতভাবে সবাই জানত ।

কিন্তু ইতিহাস দর্শন ঘাটলে দেখা যায় ইতিহাস চিরকালই অবাধ্যদের দ্বারা লিখিত হয়! ১৮৩ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর যখন কপিল দেবের দল ড্রেসিংরুমে ঢুকেছিল, তখন সেখানে কোনও শ্মশানের নীরবতা ছিল না। মহিন্দর অমরনাথের সেই শান্ত চোখ কিংবা মদনলালের চিবুকের সেই aggression—এর মধ্যে কোনও পরাজয়ের আতঙ্ক ছিল না, বরং মনের মধ্যে চলছিল মরণ কামড় দেওয়ার প্রস্তুতি। আজ ৪৩ বছর পর যদি কেউ লর্ডসের সেই আর্কাইভাল রেকর্ড বা ব্রিটিশ সংবাদপত্রের হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখেন, এবং লেখাগুলো পড়েন তাহলে বুঝতে পারবেন ১৯৮৩ সালের লর্ডসের ড্রেসিংরুমের সেই ব্যালকনিটা ছিল আসলে একটা ক্ষমতার ভরকেন্দ্র স্থানান্তরের মঞ্চ ।

খেলাটা বদলে গেল একটা ক্যাচে। স্যার ভিভ রিচার্ডস যখন মদনলালকে হুক করতে গিয়ে আকাশে বলটা তুললেন, কপিল দেব তখন পিছনের দিকে দৌড়াচ্ছেন। প্রায় ২০ গজ পিছন ফিরে দৌড়ে লর্ডসের তপ্ত দুপুরে কপিল যে ক্যাচটা ধরেছিলেন, সেটা শুধু ভিভ রিচার্ডসের উইকেট ছিল না; ওটা ছিল গত দুই দশক ধরে বিশ্বক্রিকেটকে শাসন করা ক্যারিবিয়ান রাজত্বের অহংকারের পতন।

লন্ডনের ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকা পরদিন সকালে তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছিল এটা শুধুমাত্র একটি ক্রিকেট ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল ক্রিকেটের মক্কা লর্ডসে আন্ডারডগদের দ্বারা পরিচালিত এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান।

লন্ডনের আকাশ যখন তেরঙায় ঢাকছে, কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা লিখল এক কালজয়ী লাইন দিয়ে "বিশ্বের মাথায় ভারত: কপিল-বাহিনীর লর্ডস জয় আসলে কোটি কোটি ভারতীয়ের আত্মমর্যাদার পুনরুত্থান।" আনন্দবাজার পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদক একজন গবেষক-সাংবাদিক ভারতের বিশ্বকাপ জয়কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন, "এই জয় প্রমাণ করল, সাহেবদের খেলায় সাহেবদের মাঠে তাদের কেই হারিয়ে বিশ্বসেরা হওয়া যায়। এই ১৮৩ রান আসলে ভারতের অর্থনৈতিক দীনতার বিরুদ্ধে এক চরম জেদ।" ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক কেন ১৯৮৩-র ২৫ জুন ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জলবিভাজক রেখা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তৎকালীন ভারতের সমাজ ও অর্থনীতির ভেতরে। ১৯৮৩-র ভারত আজকের ডিজিটাল, আর্থিক পরাশক্তি ভারত নয়। ওটা ছিল লাইনে দাঁড়িয়ে রেশন নেওয়া, ফরেন এক্সচেঞ্জের জন্য আকুল হওয়া, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের গোলক ধাঁধায় ঘুরতে থাকা একটা পরিশ্রান্ত দেশ। দূরদর্শনের সাদা-কালো পর্দায় সেদিন সমগ্র ভারতবাসী আর তার আমলারা যা দেখলেন, তা আসলে এক নতুন ভারতের জন্মসনদ। লর্ডস, যা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ক্রিকেটিং প্রতীক, সেখানে দাঁড়িয়ে এক ঝাঁকড়া চুলের হরিয়ানার কৃষক-পুত্র যখন প্রুডেন্টিয়াল কাপটা উঁচিয়ে ধরলেন, সেদিন থেকেই আমাদের মধ্যে ভেঙে গেল এক মনস্তাত্ত্বিক দেওয়াল। সাহেবদের তৈরি খেলায়, সাহেবদের ঘরের মাঠে, সাহেবদের চেয়েও ভাল খেলে বিশ্বজয়—এর চেয়ে বড় ডিকলোনাইজেশন আর কী হতে পারে!

এই জয়ের হাত ধরেই ক্রিকেটের অর্থনীতি বদলে গেল। লন্ডনের ইম্পিরিয়াল ক্রিকেট কনফারেন্স বুঝতে পারল, ক্রিকেটের চালিকাশক্তি লর্ডস বা মেলবোর্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই , তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে কলকাতার ইডেন গার্ডেনস বা বোম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। সমগ্র উপমহাদেশে সমস্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে। জগমোহন ডালমিয়ারা পরবর্তীকালে যে বিশ্বক্রিকেট শাসন করতে পেরেছিলেন, তার প্রথম বীজটি বোনা হয়েছিল ২৫ জুনের সেই অলৌকিক বিকেলে।

আজকের কর্পোরেট আইপিএল-এর যুগে, যেখানে ক্রিকেটারদের চুল কাটার স্টাইল নিয়ে প্রাইম টাইমে টকশো হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে সেই আশির দশকের রোমান্টিসিজম বোঝা একটু শক্ত। কিন্তু মনে রাখবেন, সেদিন অমরনাথ যখন মাইকেল হোল্ডিংকে এলবিডব্লিউ করলেন এবং লর্ডসের মাঠে হাজার হাজার ভারতীয় দর্শক তেরঙা হাতে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পিচে ঢুকে পড়ল, তখন তাঁরা শুধু মাত্র একটি জয় উদযাপন করেননি। বরং তাঁরা ব্রিটিশদের ‘জেন্টলম্যানস গেম’-এর চাবিকাঠিটা চিরতরে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।

তাই ঘুরেফিরে ওই একটাই কথা। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে লর্ডসের ওই জয়কে নিয়ে অতিরিক্ত আদিখ্যেতা করতে বারণ করব না, কারণ ওটা আমাদের প্রাপ্য ছিল। তবে এটা ভাবলে ভুল হবে যে শুধু ক্রিকেটীয় স্কিল দিয়েই আমরা সেদিন জিতেছিলাম, তা কিন্তু নয়। আসলে সেদিন জিতেছিল আমাদের খ্যাপামিটা, যা কোনও লজিক মানে না, যেখানে বুকিদের বাজার দর ছিল ১:৬৬। সেদিন কোনও বুকি ভাবতেও পারেনি, ভারতবর্ষ জিততে পারে।

৪৩ বছর পর আজ যখন আমরা একটা এসি ঘরের গদিতে বসে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে খেলা দেখি, তখন ওই ২৫ জুনের ধুলোওড়া লর্ডসের পিচটাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় —বাঙালির বা আপামর ভারতীয়ের ট্রফি ক্যাবিনেটে যতই সোনাদানা জমুক না কেন, ওই প্রথম প্রেমে পড়ার মতো যে বোকাবোকা, বুক কাঁপানো আনন্দ, তার কোনও রিপ্লে হয় না। ওটা একবারই হয়। জীবনানন্দের ভাষায়, "এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।" এই কারণেই ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয় আজও আমাদের কাছে অমর হয়ে আছে।