নাতালিয়া গেরাসিমোভা, পিএইচডি (ইতিহাস)
বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন দু'টি নাম আছে, যেগুলো একই সুরের ভেতরে আলাদা আলাদা স্বরের মতো বাজতে থাকে-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলাম। অনেক সময় ওঁদের একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেখা হয়-একজন ভাবুক, অন্তর্মুখী, মেলবন্ধনের কবি; আরেকজন বিদ্রোহী, আগুনের মতো তীব্র, তাড়না আর প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। কিন্তু এই ভাগটা যতটা সুবিধেজনক, ততটাই অসম্পূর্ণ। আসলে, দু'জন মিলে যে ঐক্য তৈরি করেন, তা না বুঝলে শুধু বাংলা সাহিত্যই নয়, বাংলার গভীর আত্মিক আর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকেও পুরো বোঝা যায় না। রাশিয়ায় রবীন্দ্রনাথকে খুব তাড়াতাড়ি আবিষ্কার করা হয়েছিল, এবং এক ধরনের স্বতন্ত্র মনোযোগ দিয়ে তাঁর লেখা পড়া হত। ১৯১৩ সালের শেষ দিকেই গীতাঞ্জলি-র প্রথম রুশ অনুবাদ বেরোয়। লন্ডনে বসে সেই অনুবাদ করেছিলেন আইজ্যাক স্কলভস্কি (Isaac Shklovsky), তখন তিনি মস্কোভস্কি ভেদোমস্তি-র সংবাদদাতা। তার পরের বছর, ১৯১৪-য়, আরও পূর্ণাঙ্গ একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়-অনুবাদ করেন নিকোলাই পুশেশনিকভ, আর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ইভান বুনিন। রাশিয়ার বুদ্ধিজীবী মহলে রবীন্দ্রনাথ শুধু 'বিদেশি কবি' হয়ে থাকেননি-তাঁর লেখার মধ্যে পাঠকেরা পেয়েছিলেন দার্শনিকের অন্তর্দৃষ্টি। লিও তলস্তয় বা ফিয়োেদর দস্তভয়েস্কির লেখার পাশাপাশিই তাঁর লেখায় তাঁরা পেলেন নৈতিকতা, বিশ্বাস, আর মানুষের জীবনের অর্থের অনবরত সন্ধান। যে সাংস্কৃতিক পরিসর আত্মসমীক্ষায় অভ্যস্ত ছিল, সেখানে রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ সহজেই পাকাপাকি জায়গা করে নিল। অন্যদিকে, নজরুল রাশিয়ার সাংস্কৃতিক চেতনায় প্রবেশ করেন একটু পরে, সোভিয়েত আমলে। তাঁকে মূলত পড়া হত বিদ্রোহের কবি হিসেবে- এমন একজন, যাঁর লেখা সমাজের ভাঙাগডা আর পরিবর্তনের ভাষার সঙ্গে মিলে যায়। বিদ্রোহী বা অগ্নিবীণা-র মতো কবিতা, তাদের তীব্রতা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিবাদ নিয়ে, স্বাভাবিকভাবেই সাড়া ফেলেছিল সেই পাঠকের কাছে, যারা বিপ্লবী ভাবনায় গড়ে উঠেছে। যেখানে রবীন্দ্রনাথকে ভাবনা আর দর্শনের কবি হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেখানে নজরুলকে বোঝা হয়েছিল কাজ আর প্রতিরোধের কবি হিসেবে। তাই রুশ সংস্কৃতির ভেতরে যেন দু'জন আলাদা হয়ে দাঁড়ালেন-রবীন্দ্রনাথ মানবতাবাদী চিন্তক, নজরুল সংগ্রামের কণ্ঠস্বর। কিন্তু এই বিভাজনটা আসলে ওঁদের সম্পর্কের আসল ছবি নয়, বরং মানুষ তাঁদের কেমন ভাবে পড়ছেন ও গ্রহণ করছেন, তার ছবি। বাংলায় কিন্তু এভাবে ওঁদের আলাদা করে দেখা হয়নি কখনও। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের সম্পর্কের ভিতটা ছিল স্বীকৃতি, বিরোধ নয়। তরুণ নজরুল রবীন্দ্রনাথকে দেখতেন গভীর শ্রদ্ধায়-একজন শিল্পী আর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। আর রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে কখনওই প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেননি, বরং একই স্রোতের ভেতরে নতুন, প্রয়োজনীয় শক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর বসন্ত নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করা-এই নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতিরই চিহ্ন। ১৯২০-র দশকে শান্তিনিকেতনে তাঁদের সাক্ষাৎগুলোও মনে রাখা হয় কোনও সাহিত্যিক দ্বন্দ্ব হিসেবে নয়, বরং একসঙ্গে থাকার মুহূর্ত হিসেবে-দুই আলাদা স্বর, কিন্তু একই মাটিতে তাদের শিকড়। ওঁদের আলাদা করে তোলে উদ্দেশ্য নয়, প্রকাশের ভঙ্গি। রবীন্দ্রনাথের লেখা অনেক সময় এগিয়ে যায় মেলবন্ধনের দিকে-মানুষ, সময়, প্রকৃতি আর অসীমের সম্পর্ক বোঝার দিকে। আর নজরুলের লেখা জোর দিয়ে বলে সংগ্রামের কথা-ব্যক্তির নিজের কথা বলার অধিকার, প্রতিরোধের অধিকার, স্বাধীনতা দাবি করার সাহস। কিন্তু এই ফারাকের নেপথ্যে একটা মিল আছে-মানুষের কণ্ঠের প্রতি একটা মর্যাদা আছে, আর সেই মর্যাদাকে খাটো করা যে অপরাধ- তার দৃপ্ত ঘোষণা আছে। এই কারণেই "দুটি সূর্য” কথাটা শুধু কবিতার কথা নয়, একেবারে ঠিক উপমা। এক সূর্য নরম আলোয় ধীরে ধীরে আলোকিত করে-ভোরের মতো। আরেক সূর্য জ্বলে ওঠে তীব্রতায়, সরাসরি, অনমনীয়-দুপুরের রোদ্দুরের মতো। দু'জন মিলে আলোর বৃত্তটা সম্পূর্ণ করেন। আজও, রাশিয়া আর বাংলার মধ্যে যখন সাংস্কৃতিক বোঝাপড়ার নতুন পথ খোঁজা হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল শুধু অতীতের মানুষ নন-তাঁরা এই চলমান কথোপকথনের সক্রিয় অংশ। রবীন্দ্রনাথ শেখান মন দিয়ে শোনা-অস্থির না হয়ে। নজরুল শেখান কথা বলা-যেখানে চুপ করে থাকা সহজ, সেখানে মুখ খোলার সাহস। এই দু'য়ের মাঝখানেই তৈরি হয় কোনও চূড়ান্ত উত্তর নয়, বরং এক চলতে থাকা আলাপ-আর সেই আলাপের ভেতরেই তো সংস্কৃতি জন্ম নেয়। এই বর্ষপূর্তির বছরে, দীর্ঘ ও ক্রমাগত বদলে যাওয়া আদানপ্রদানের মধ্যে তৈরি হওয়া একজন রুশ পাঠক হিসেবে, আমি আবার ফিরে গিয়েছিলাম তাঁদের লেখার কাছে, তাঁদের মননের কাছে, তাঁদের চিন্তার কাছে। বিশ্লেষণ করতে নয়, বরং শান্ত হয়ে তাঁদের বুঝতে। এবং সেই বুঝতে চাওয়ার ফল হিসেবে তৈরি হয়েছে এই দুটি কবিতা। কথোপকথনের ভঙ্গিতে। ব্যাখ্যা করার চেষ্টা নয়, বরং বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা। আর সেই বুঝতে চাওয়ার মধ্যেই কথোপকথনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা ছোট প্রয়াস।
রবি
হুগলি নদীর উপরে- বাতাস। না, নীরব নয়। তবে, একবারে তাকে ধরা যাবে না।
নদীর তীরে কাপড়গুলো উড়ছে
যেন কেউ আঁকছে, লিখছে একটা পাণ্ডুলিপি একবার খুলে যাচ্ছে আবার গুটিয়ে নিচ্ছে নিজেকে, পড়তে দেবে না।
একটি ছেলে জলে দাঁড়িয়ে দেখছে যেন একটা শব্দের জন্য তার প্রতীক্ষা নয় বরং সেই মুহূর্তের জন্য যখন তা নিয়ন্ত্রণ হারাবে।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি নীরবতা বজায় রাখে। তাদের থামগুলো ইতিমধ্যেই কথা বলেছে।
দিনলিপিতে- কোনও লেখা নয় একটা ধ্বনি মিশে গেছে।
নদী কথা বলে কণ্ঠস্বর ছাড়াই। আর যে তা শুনেছে, কিছুই যোগ করেনি।
কাজী নজরুল ইসলাম
আমার নিয়তি ছিল- জ্বলতে থাকা নিজের জন্য নয় যারা অন্ধকারে হাঁটছে তাদের জন্য
আমি- বাংলার সন্তান
আমি কথা বলেছি তাদের হয়ে যারা কথা বলতে পারেনি
আমি দেখেছি কীভাবে ভালবাসা হেলান দেয় ব্যথার উপর কীভাবে তা থেকে বিদ্রোহ জেগে ওঠে কেমন করে পৃথিবী বলে যেতে দেব না।
তারপর সেই আগুন ঘুরে গেল ভিতরদিকে।
জ্বলতে লাগল- আলোহীন কেউ দেখতে পেল না।
না, মিলিয়ে গেল না, চারিয়ে গেল।
আমার স্বর হয়ে উঠল আমার শ্রবণ।
আমি বলি না আর আমি শুনি।
আগে যেখানে আগুন ছিল- এখন, নীরবতা।
কিন্তু আগুন বিদায় নেয় না শুধু আমার মধ্যে আর নেই।
উপরের কবিতা দুটির রচয়িতা লেখক (নাতালিয়া গেরাসিমোভা)















