ম্যাক্সিম ভি. কোজলভ (কলকাতায় রাশিয়ান কনসাল জেনারেল)    

প্রতি বছর ৯ মে গোটা রাশিয়া জুড়ে উদযাপিত হয় ‘গ্রেট পেট্রিয়টিক ওয়ারের’ (১৯৪১–১৯৪৫) বিজয় দিবস। রুশ জনগণের কাছে এই দিনটা শুধুমাত্র একটা সরকারি ছুটি নয়। বরং এই দিনটা নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য যে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ গিয়েছে তারই এক পবিত্র স্মৃতি। 

নাৎসি জার্মানি ও তার মিত্ররা মিলে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল তাতে প্রাণ গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ২ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষের। আমার দেশের কোনও পরিবার এই যুদ্ধের ছোঁয়া থেকে রক্ষা পায়নি।

অবশ্য, বিজয় দিবসের উদযাপনের আগে রাশিয়ার জনগণ আরও একটা দিনকে স্মরণীয় করে রেখেছে যা গোটা দেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনগণের কাছেও পবিত্র। এই দিনটায় লক্ষ লক্ষ সোভিয়েত নাগরিকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই আমরা। যারা যুদ্ধের সময় নাৎসিদের গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন।

২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর, রুশ ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। যার মাধ্যমে ১৯ এপ্রিলকে স্মরণ করে রাখা হয়।

রাশিয়ার ইতিহাসে ‘গ্রেট পেট্রিয়টিক ওয়ার’ চলাকালীন এই দিনেই গণহত্যা চালিয়েছিল নাৎসি এবং তার মিত্ররা। এই তারিখটি ১৯৪৩ সালের একটি ডিক্রিকে মনে করায়। 

সেখানে প্রথমবার সোভিয়েতের সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে নাৎসি নিধননীতির নথিভুক্ত প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া প্রতিবছর ১৯ এপ্রিল দিনটি 'ডে অফ ইউনিফায়েড অ্যাকশনস' হিসেবে পালন করে থাকে। যার লক্ষ্য হিটলারের জল্লাদ বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নিহতদের স্মৃতি চিরদিন ধরে রাখা।

নাৎসি জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চালিয়েছিল। তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনার নথিতে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল এক নির্মম নিধননীতি।

যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের কয়েক কোটি সাধারণ নাগরিককে নির্বাসন, দাসত্ব এমনকী প্রাণে মেরে ফেলার কল্পনা করা হয়েছিল। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে ইউরাল পর্বতমালার ওপারে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। 

নাৎসি এবং তার মিত্ররা খাদ্য সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজের হাতে নিয়ে নিতে চেয়েছিল যাতে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে না খাইয়ে তাদের ওপর দিনের পর দিন অত্যাচার চালানো যায়। এই বর্বর পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছিল। নাৎসিরা আমাদের দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করেছিল জাতি, বর্ণ বা ধর্ম নির্বিশেষে।

‘গ্রেট পেট্রিয়টিক ওয়ার’ চলাকালীন নাৎসি ও তাদের সহযোগীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন ২৭ মিলিয়নেরও বেশি সোভিয়েত নাগরিক। যার মধ্যে ছিলেন সাধারণ মানুষও।

ইতিহাসবিদদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমাদের দেশের প্রায় ১৩ মিলিয়ন সাধারণ মানুষ নাৎসিদের নির্দয় অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। অন্ততপক্ষে ৭৪ লক্ষ সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। 

তাঁদের মধ্যে কাউকে গুলি করে, কাউকে পুড়িয়ে অথবা কাউকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হয়েছিল। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে কঠোর পরিশ্রম ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আরও ২২ লক্ষ মানুষের মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যু হয়।

১০ লক্ষেরও বেশি শিশু ও কিশোরকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। আরও লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে জোর করে জার্মানিতে ক্রীতদাস হিসেবে পাঠানো হয় যার মধ্যে অনেকেই আর ফিরে আসেননি।

শত্রুদেশের অধিকৃত অঞ্চলগুলিতে ৪১ লক্ষেরও বেশি মানুষ অকালে প্রাণ হারিয়েছিলেন। শুধু লেনিনগ্রাদ অবরোধেই কম করে ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল যাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ওয়ার ক্রাইম হিসেবে ধরা হয়। নাৎসিদের এই নৃশংসতা ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও সুসংগঠিত যা গোটা একটা জাতিকে মুছে ফেলার এক বৃহত্তর নীতির অংশ।

বর্তমানে রাশিয়ায়, তৎকালীন সোভিয়েত ভূখণ্ডে সাধারণ মানুষের গণহত্যা, অনাহারে ফেলা আনুষ্ঠানিক ও সরকারিভাবে সোভিয়েত জনগণের ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে থাকে।

লেনিনগ্রাদ অবরোধের গল্পের চেয়ে আর কোনও নথিই এত জোরালোভাবে এই গণহত্যার বাস্তবতা আমার কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি। ১৯৮০-এর দশকের শুরুর দিকে যখন আমি লেনিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলাম, তখন অবরোধটা ততটা পুরনো হয়নি। 

আমার চারপাশের মানুষের কাছে এই অবরোধটা তখনও খানিকটা বেঁচে ছিল। আমার কয়েকজন অধ্যাপক নিজেরা অবরুদ্ধ লেনিনগ্রাদে ছিলেন। কথা বলতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই তারা বক্তৃতার মাঝে থেমে যেতেন এবং আস্তে আস্তে বলতেন দিনে ১২৫ গ্রাম রুটির কথা, চামড়া সেদ্ধ করে স্যুপ বানানোর কথা, লাডোগা হ্রদের বরফে ঢাকা ‘দ্য রোড অফ লাইফ’-এর কথা এবং সেই প্রিয়জনদের কথা যারা আর কখনও ঘুম থেকে ওঠেননি। বক্তৃতার মাঝে এসব শুনলে গোটা ক্লাস একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে যেত।

আমি লেনিনগ্রাদের অনেক স্মৃতিসৌধ দেখেছি। এর মধ্যে পিসকারেভস্কয় স্মৃতি সমাধিক্ষেত্র রাশিয়ার প্রত্যেকটি মানুষের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে একটি। এই সমাধিক্ষেত্রের লম্বা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে লুকিয়ে থাকা লাউডস্পিকার থেকে মেট্রোনোমের টিকটিক শব্দ ভেসে আসত।

এটা সেই একই মেট্রোনোম যা অবরোধের সময়ও একবারের জন্য বন্ধ হয়নি। শহরের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রতীক হিসেবে সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমি গণহত্যার আসল ছবিটা অনুভব করেছি।

পিসকারেভস্কয় একটা বিরাট কবরস্থান। প্রায় সাড়ে চার লক্ষ মানুষ এই লম্বা এবং সমতল ঢিবির নিচে শায়িত রয়েছেন। আমি ১৯৮০-এর দশকের এক তরুণ ছাত্র হিসেবে সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতাম যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া অনেক বয়স্ক মানুষ এসে গ্রানাইটের উপর ফুল রেখে স্মৃতিচারণ করছেন। তারা ছিলেন আমার অধ্যাপকদের বয়সী।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম, যে ১০ লক্ষ লেনিনগ্রাদবাসী অনাহারে মারা গিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কারও না কারও মা, বাবা, শিক্ষক, বন্ধু বা সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যে সমস্ত প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে দেখা করেছি সেটা আমার নিজের অধ্যাপক হোক বা রাস্তার সাধারণ মানুষ, যারা অবরুদ্ধ লেনিনগ্রাদে যুদ্ধের যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন তাঁরাই ছিলেন সেই পরিসংখ্যানের জীবন্ত কণ্ঠস্বর। আর বর্তমানে সেই ঘটনার কয়েক দশক পরে, আমি তাদের গল্পগুলো নিজে সঙ্গে নিয়ে বয়ে বেড়াই।

সোভিয়েতের মানুষদের গণহত্যা শুধু একটি আইনি পরিভাষা বা কোনও ইতিহাস বইয়ের শ্রেণিবিভাগ নয়। এটা কোটি কোটি সাধারণ মানুষের কাহিনি, যাদের ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে ফেলা হয়েছে, গুলি করা হয়েছে, পোড়ানো হয়েছে এবং যাদের স্মৃতি আমরা প্রতিদিন নিজেরা বয়ে নিয়ে চলেছি।

আমাদের লক্ষ্য এই পবিত্র স্মৃতিকে যেন ইতিহাস থেকে এবং আগামী প্রজন্মের মন থেকে যেন কখনও মুছে না ফেলা হয়। শুধুমাত্র আমাদের যৌথ প্রচেষ্টাই এই সত্যিটাকে মিথ্যা, ভুল বর্ণনা ও বিকৃত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। যাতে করা নিও-নাৎসিজমের পুনরুত্থানের মোকাবিলা করা যায় এবং মানবতার বিরুদ্ধে বর্বর অপরাধের পুনরাবৃত্তি এড়ানো যায়।

নাৎসি অপরাধের ওপর সীমাবদ্ধতার কোনও আইন নেই। কবি ওলগা বার্গগলৎস, যিনি লেনিনগ্রাদের অবরোধ থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। তিনি এমন কিছু শব্দ লিখে গিয়েছিলেন যা পিসকারেভস্কয় সমাধিক্ষেত্রের পাথরে খোদাই করা আছে। সেখানে লেখা আছে, ‘No one is forgotten and nothing is forgotten.’