প্রতীক্ষা ঘোষ:
একঘেয়ে জীবনে আটকে পড়লে হঠাৎ একদিন ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ করা যায়। কীভাবে? এই বাক্স-প্যাঁটরা গুছিয়ে দু’জন বন্ধুকে বগলদাবা করে নিয়ে কলকাতা থেকে মাত্র ৩০ মাইল দূরে গেলেই হয়। তবে হ্যাঁ, দু’জন বন্ধুকে কিন্তু সঙ্গে নিতেই হবে। এরা দু’জন তো আপনারই আলাদা দুই সত্ত্বা। তাদের বাদ দিলে হয়! এদের একজন ফেরার সময়ে তেলেনাপোতাকে তেলেনাপোতাতেই রেখে আসবে। অপরজন হৃদয়ে করে নিয়ে আসবে। আর ফিরতি পথে যামিনী যখন আপনার ছিপ ফিরিয়ে দিতে আসবে তখন আপনি বলবেন, ‘থাক না। প্রতিবার তো আর মাছ আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না’। আপনারই মতো বাকি সকলেও কথা দেবে, ‘আমি আবার আসব, যামিনী’। তবে সত্যিই কি আবারও ফেরা যায় তেলেনাপোতায়? যামিনীর কাছে?
প্রেমেন্দ্র মিত্রের এই ছোটগল্প অনুসারে ‘ঘ্যাঁঘাসুর’ প্রযোজিত নাটকে আপনি দেখতে পাবেন লেখক যখন দু’দিনের ছুটি কাটাতে বার হচ্ছেন, তখন ধ্রুব মুখার্জির কন্ঠে ভেসে আসছে ‘দেখা দাও ঘনশ্যাম’। যেন লেখকের অন্তরে যে তেলেনাপোতা রয়েছে, প্রত্যেকের অন্তরে যে তেলেনাপোতা রয়েছে, সেখানে ঘাপটি মেরে যে যামিনী রয়ে গিয়েছে আজও, তার আর্তি হয়ে উঠে আসছে এই গান। আবার যখন মাছ ধরতে গিয়ে লেখকের চোখ পড়ে যামিনীতে, তখন শোনা যায় ‘আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা’। শহুরে ভ্রমর এল গ্রামীণ ফুলের কাছে। ভ্রমর যেমন আজীবন চঞ্চল, অস্থীর, এল এক ফুল থেকে আরেক ফুলে যাওয়াই যার স্বভাব, খুঁজে খুঁজে সেই ভ্রমর বার করল নিজেকে উন্মুক্ত রেখে অপেক্ষমাণ এই গ্রামের ফুলটিকে। এই নির্দিষ্ট গানটির প্রয়োগে, একটি সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠল অসাধারণ।
গান চয়নের মতোই অসাধারণ ‘ঘ্যাঁঘাসুরের’ আলোর কাজ। যখন গ্রামে পৌঁছে লেখকের রাতে ঘুম আসছিল না, তখন ভাঙা বাড়ির ছাদে উঠে প্রথম দেখা মিলল যামিনীর। দেখা পেলেন লেখক নিজের হাতে থাকা টর্চ জ্বেলে। এই একটি টর্চ যেন তুলে ধরল নিজের ভিতরের আলোকে। বাইরের আলো দিয়ে অন্যকে দেখা যায়, কিন্তু নিজের গভীরে লুকিয়ে থাকা ‘যামিনী’কে দেখতে গেলে নিজের অন্তরের আলো জ্বালাতে হয়। আলোর সুন্দর কাজ দেখা যায় বিদায়বেলাতেও। শহরে ফেরার আগের রাত্রে যামিনীকে আবারও যখন দেখতে চেয়েছেন লেখক, তখন যামিনী দর্শকের মধ্যে থেকে উঠে আসেন মঞ্চে, হাতে তাঁর জ্বলন্ত মোমবাতি। মঞ্চে তখন আরও অনেকে রয়েছেন, তাঁদের হাতেও মোমবাতি জ্বলছে। এখানে উল্লেখ্য কোরাসে থাকা অদিতি রায়, সুদীপ সরকার, মিতালী সাহা, কোয়েনা দেব, সৌমিলি বিশ্বাস, নীলাক্ষী বিশ্বাস-এর পাশাপাশি সৃজক চ্যাটার্জির আলোর কাজ। এই দৃশ্যে যামিনী আর শুধু নাটকের চরিত্র রইল না, দর্শকদেরই এক সত্তা হয়ে উঠল। যেন শুধু লেখক নয়, দর্শকেরাও খুঁজছেন, তাঁদের ভিতরে থাকা যামিনীকে। সেই যামিনী যে নিজের হাতে ধরা মোমবাতির আলো অর্থাৎ নিজের অন্তরের শিখা ছড়িয়ে দিচ্ছে বাকিদের মধ্যেও।

মঞ্চসজ্জার কথা না বললেই নয়। কাপড় কেটে তৈরি করা হল জানালা। যখন এই জানালা দিয়ে অনেক দূরের দিকে তাকান লেখক, তখন তা অনায়াসে এক অস্থির জীবনকে তুলে ধরে। জীবনেও নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এমনই জানলা তৈরি করেছেন লেখক। কোনও স্থির কাঠামো নেই যে জানালার, যাকে যখন খুশি খোলাও যায়, আবার বন্ধও করা যায়। নাটকের রূপসজ্জা খুব সচেতনভাবে সরল রাখা হয়েছে।
নাটকটির আবহ এমনভাবে নির্মিত যে দর্শককে ধীরে ধীরে এক বাস্তব জগত থেকে নিয়ে যাওয়া হয় এক স্বপ্নের দিকে। যত গল্প এগোয়, গ্রামীণ সরলতা, শব্দ, ছন্দ ধীরে ধীরে বদলে গিয়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা, অপেক্ষা আর অচেনা রহস্য মিশে যায় বাতাসে। এই আবহ তৈরি করতে আলো, শব্দ, গান সব কিছু খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোনও বাড়াবাড়ি নেই। ছোট ছোট পরিবর্তনই বড় অনুভূতি তৈরি করেছে গোটা নাটক জুড়ে। বিশেষ করে যামিনীকে ঘিরে যে আবহ তৈরি হয়, সেটা একধরনের অদৃশ্য টান তৈরি করে। দর্শক যেন বুঝতে পারে, এখানে শুধু দৃশ্যমান জগত নয়, অদৃশ্য একটা স্তরও কাজ করছে।
এই নাটকে প্রথম প্রেমে পড়ার যে অনুভূতি, তার মিষ্টতা আছে। আরও একবার দেখতে চাওয়ার আকাঙ্খা আছে। খাদ্যরসিক বন্ধুর খাই খাই বাতিক আছে। গ্রামের মেলা আছে। পার্বতীর নাচ আছে। শিবের গাঁজা আছে। আছে কচু শাকের তরকারি, মশার কামড়, উপমন্যু করের বাজানো বাঁশি, অরিত্র চ্যাটার্জির বাজানো দোতারা, সৌমেন্দ্র নাথ দত্তর খোল আর শুভেন্দু চ্যাটার্জির করতাল। সমস্তটা মিলিয়ে প্রচুর বিনোদনে মাখামাখি এই নাটক। ফলে তেলেনাপোতাকে ফেলে যখন লেখক আর তার বন্ধুরা শহরে ফিরছেন তখন মন খারাপ সকলকেই গিলে ফেলেছে।
যাদবপুরের অনুচিন্তন আর্ট সেন্টার, এই নাটকটির উপস্থাপনার জন্য কিছুটা ছোট। তবুও পরিচালক সৃজক চ্যাটার্জি যেভাবে জায়গাটাকে ব্যবহার করেছেন তা সত্যিই অভাবনীয়। একটা চৌকি কী অদ্ভুতভাবে শহর বদলে গ্রাম ঘুরে আবারও শহরে ফেরে, আবারও পিছুটানে ফিরে আসে। সব মিলিয়ে ঘ্যাঁঘাসুরের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ আমাদের ঘুরিয়ে আনে নিজেদের ভিতরে থাকা গ্রাম থেকে। এই নাটক নিজের ভিতরে থাকা যামিনীর চোখে চোখ আটকে গেলে শুনিয়ে দেয়, ‘আমি ফুল, বন্ধু ফুলের ভ্রমরা’, এবং জানতে চায়, সত্যিই কি আবারও তেলেনাপোতায় ফেরা যায়? যামিনীর কাছে ফেরা যায়?















