বুড়োশিব দাশগুপ্ত
দিল্লিতে আয়োজিত ‘এআই সামিট ২০২৬’-এর মাধ্যমে ভারতের কাছে সুযোগ ছিল নিজের প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। গুলল, সান মাইক্রোসিস্টেম, মাইক্রোসফট এবং রিলায়েন্স জিও-র বড় বড় মাথারা উপস্থিত ছিলেন এই সম্মেলনে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সেই সময় ভারত সফরে থাকায় এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু হায়! আয়োজকরা করে ফেললেন বড়সড় গণ্ডগোল। কুখ্যাত যানজট আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের কাছে ভুল বার্তা পাঠিয়েছে। সর্বোপরি, উত্তর প্রদেশের 'গালগোটিয়া' একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি চিনা এআই রোবটকে নিজস্ব সৃষ্টি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছিল। এর ফলে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ব্র্যান্ডের ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে ভারতীয় প্রতিভা বিশ্বব্যাপী সম্মানিত হয়েছে। বিশ্বের বেশিরভাগ বৃহৎ আইটি কোম্পানির নেতৃত্বে রয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা। তবুও, ভারতীয়রা কখনও ভারতের মাটিতে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত কোনও মৌলিক হার্ডওয়্যার বা সফ্টওয়্যার তৈরি করতে পারেননি। এর একটি কারণ অবশ্যই গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) -এর উপর সরকারের কম অগ্রাধিকার। সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা গিয়েছে যে, গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র ০.৬৫% ব্যয় করা হয়। যেখানে চীনে ২.৪% এবং আমেরিকায় ৩% ব্যয় করা হয়। সম্প্রতি, সরকার বাস্তবটা বুঝতে পেরেছে। পাঁচটি নিজস্ব মাইক্রোচিপ কারখানায় বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই কি বড্ড দেরি হয়ে যায়নি? চিপ তৈরিতে আমরা কি কোরিয়া এবং তাইওয়ানের মতো দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারি?
দেশের প্রতিভাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রকৃত পরিকাঠামো তৈরিতে সরকার তেমন মাথা ঘামায় না বলে মনে হয়। স্বাধীনতার পর দূরদর্শী ব্যক্তিরা আইআইটি এবং আইআইএম-এ ‘মন্দির’ তৈরি করেছিলেন এবং মানবসম্পদ প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা চাকরির জন্য বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। এখানে কোনও সুযোগ পাননি। সাম্প্রতিক সময়ে রাস্তাঘাট এবং সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু পরীক্ষাগার এবং গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য নয়। ২০২০ সালে যখন নতুন শিক্ষানীতি চালু করা হয়েছিল, তখন বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেছিলেন যে এর যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য জিডিপির ৬% বাজেট প্রয়োজন হবে। সরকার নীতিগতভাবে তখন এতে সম্মত হয়েছিল এবং এটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার উপর কেন্দ্রীয় বাজেট এখনও জিডিপির ২.৫%-এ রয়ে গিয়েছে। যেহেতু শিক্ষা যুগ্ম তালিকায় রয়েছে, তাই শিক্ষার উপর রাজ্য এবং কেন্দ্রের সম্মিলিত ব্যয় জিডিপির ৪%-এর বেশি হবে না।
তাই অনিবার্য ঘটনাটি ঘটেছে। ভারত সকল ধরণের উৎপাদনের ক্ষেত্রেই ‘কপিক্যাট’ হয়েই রয়ে গিয়েছে। কারণ, শিল্প বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ‘মৌলিক’ গবেষণার জন্য কোনও তহবিল বা সুযোগ নেই। আমরা বিনোদন বা ইভেন্টে বিশ্বাস করি, মৌলিক গবেষণায় নয়। চীনা রোবোটিক কুকুরটি গালগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাভিলিয়নে প্রচুর ভিড় জমাচ্ছিল, যতক্ষণ না কর্তৃপক্ষের নজরে ভুলটি ধরা পড়ে এবং সামিট ছেড়ে তাদের চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু ততক্ষণে যা ক্ষতি হ্ওয়ার হয়ে গিয়েছে। বিশ্ব ভারতের আসল দুর্বলতা সম্পর্কে জানতে পেরেছে: ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে এখনও পুরোপুরি না বেরিয়ে আসতে পারা দেশ। চিন্তায় সে এখনও পরনির্ভর।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার জন্য যথেষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ভারতের সম্পদ আছে এবং বড় চিন্তা করা দোষের কিছু নয়। কিন্তু 'দেখনদারি' করে উৎকর্ষতা অর্জন করা যায় না। এর জন্য মানসিক দৃঢ়তা, টেকসই মৌলিক গবেষণা প্রয়োজন। শিল্প এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে মৌলিক কিছু তৈরিতে সহযোগিতা করতে হবে। ঐতিহ্যবাহী উৎকর্ষ কেন্দ্রগুলিকে পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। নতুন প্রতিষ্ঠানগুলি ক্রমশ প্রচারের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ইতিমধ্যেই ভারতে প্রবেশ করেছে। যদি কোনও ছাত্র ভারতে থেকে হার্ভার্ড, এমআইটি বা অক্সফোর্ড ডিগ্রি অর্জন করতে পারে, তাহলে কে দেশের বেসরকারি ডিগ্রি খুঁজবে? যদি ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়, তবে তাদের মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। ‘কপিক্যাট’ মানসিকতা ভারতকে কোথাও নিয়ে যাবে না। চকচকে এবং ঝলমলে পরিকাঠামোর রঙিন জাঁকজমক যথেষ্ট নয়।
