উদ্দালক
চলচ্চিত্র আসলে শুধু গল্প বলে না, বলে অনুভূতির কথা। আর অনুভূতি কখনও কখনও ছাড়িয়ে যায় শব্দের গণ্ডি। তা ধরা দেয় দৃশ্যে। আর সেই দৃশ্য ক্রমে যাত্রা করে কাব্যের দিকে। কী আশ্চর্য এক বৃত্ত! তাই শিল্প কখনও কখনও সমস্ত অন্য মাধ্যমের সীমানা অতিক্রম করে পৌঁছে যায় অনির্বাণ কাব্যের দিকে। রঞ্জন ঘোষ পরিচালিত 'অদম্য' তেমনই যাত্রা করে এক ছায়াপথের দিকে। যেখানে এমন সব দৃশ্যকল্প তৈরি হয়, যে দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে আসলে জীবনকে কবিতার মতো করে দেখাতে শুরু করে এই সিনেমা। বাংলা বাণিজ্যিক ছবির চলতি ন্যারেটিভ ধর্মী সিনেমার বাজারে সেই কারণেই এক অনন্য উদাহরণ এটি। হয়তো প্রচলিত ধারণার বাইরে যেতে গিয়ে কোথাও বাণিজ্যের স্রোতে একে লড়াই করতে হচ্ছে, তবু, সেই লড়াই তো থেমে যাচ্ছে না, বরং তা জুটিয়ে নিচ্ছে আরও অসংখ্য অদম্য মানুষকে, যাঁরা ছবির কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে।
এই ছবিতে একক অভিনয়ে মাতিয়ে দিয়েছেন আরয়ুন ঘোষ। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের কোনও এক সময়কে ধরে এই সিনেমার গল্প অতিবাহিত হয়। গল্পটা এখানে বলার সমালোচকের কাজ নয়। তাই গল্প বলছিও না। তবে বলতে হবে কুশীলবদের কথা। বিশেষত দুই অভিনেতা আরয়ুন আর সেঁজুতি রায় মুখার্জি মুল দুই চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন। এ ছাড়াও সামান্য কয়েকটি দৃশ্যে বাকি কয়েকজনকে দেখা যায়, তবে বেশিরভাগটা জুড়ে এঁরাই। মা ও সন্তানের এই সম্পর্ক ও স্নেহের মধ্যে কোথাও কি পাঁচিল তুলে দাঁড়িয়েছে রাজনীতির আদর্শ। আসলে আদর্শের সঙ্গে ব্যক্তির লড়াই কতটা, আর সে লড়াই একটা মানুষকে শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যায়। যেখানে সে একা, যেখানে তার কেউ নেই। সেই একা, একক মুহূর্ত আর তার সঙ্গে লড়তে থাকা মানুষটার লড়াই নিয়ে এই ছবি আশ্চর্য এক গাথা তৈরি করে। যে ব্যালাডে মিশে যায় বাংলার রাজনীতির ইতিহাস।
ছবির কালার ও শট কম্পোজিশন অসাধারণ। আসলে বড়পর্দায় ছবি দেখার যে অভ্যাস সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল, তা ক্রমশ ক্ষয় পাচ্ছে। আর ক্ষয় পাচ্ছে তা ওটিটি, ছোটপর্দার তীব্র দৌরাত্মে। সেই তীব্রতার লড়াইয়ে চোখ ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, মন ভারাক্রান্ত হচ্ছে। স্বাভাবিক ভাবে বড়পর্দায় ছবি দেখার অভ্যাস পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত। ক্লোজ শট, দ্রুত কাট-এর যুগে বড় পর্দায় ছবি দেখার, বড় ক্যানভাসে ইমোশনকে ধরার চোখ যেন হারিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যেও কেউ কেউ স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটতে থাকে। রঞ্জন ঘোষের এই ছবি কিন্তু স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটার এক দিগনির্দেশ। তিনি ছবিকে এমন ভাবে সাজিয়েছেন, যেটিকে একমাত্র বড়পর্দাতেই সঠিক স্কেলে ও ক্যানভাসে বোঝা সম্ভব। একটা আদিম অরণ্যের মধ্যে একটা মানুষ কতটুকু বা এক বিশাল সাগরতটে ক্ষীণাঙ্গ যুবক কতটা খড়কুটোর মতো, সেটা বোঝাতে এই ক্যানভাসের প্রয়োজন। পরিচালক সেই কাজ করেছেন অত্যন্ত দক্ষতায়। সেই সঙ্গে একক মানুষের বাঁচার লড়াই, সমঝোতা না করার মানসিকতা ও মানবিক সম্পর্কের অনাবিল কাব্য এই ছবি। চিত্রনাট্যকার ও গল্পকার হিসাবেও পরিচালক রঞ্জন ঘোষ তাই সমাদর দাবি করেন।
ছবির চিত্রগ্রহণের কাজ করেছেন অর্কপ্রভ দাস। ভয়ঙ্কর কঠিন এই কাজটি তিনি সামলেছেন দক্ষতার সঙ্গে। এই ছবির ক্ষেত্রে সম্পাদনা ও কালার কারেকশনের কাজটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশিরভাগ লো-লাইট বা ডার্ক সিন, সেখানে আঁধারের মধ্যেও একটা নীলচে আভা তৈরি করে ছবিকে ম্যাজিক্যাল দৃশ্যপটে নিয়ে গিয়েছেন সম্পাদক ও কালারিস্ট কৌশিক রায়। ছবিতে আবহের কাজ করেছেন অভিজিৎ কুণ্ডু। সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি বিখ্যাত কবিতাকে সুর দিয়ে এই ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছে। কোন কবিতা, ছবি দেখলেই জানতে পারবেন। সেই গানের প্রয়োগ একেবারে চমকপ্রদ, কেউ ভাববেই না ওই পরিস্থিতিতে এমন একটি গানের প্রয়োগ ঘটতে পারে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ছবির সঙ্গীত পরিচালনা ও আবহ নির্মাণের কাজে যত্নশীল হওয়া জরুরি ছিল, যা হয়েছেন অভিজিৎ কুণ্ডু। গানটি গেয়েছেন দেব অরিজিৎ ও আরয়ুন ঘোষ, তাঁরাও অনবদ্য।
সব মিলিয়ে ছবিটি প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে শিল্পগুণের প্রতিটি দিক ছুঁয়েছে। মোটা দাগের কাজের দুনিয়ায় এমন ছবির বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে যে অনেকটা লড়াই করতে হবে, সেটা বলাই বাহুল্য। তবু, এমন ছবি হবে, হতেই হবে। আর এমন ছবি হলেও বর্তমান বিশ্ব চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় কিছুটা তল খুঁজে পাবে বাংলা সিনেমা।
