উদ্দালক

রাজলক্ষ্মী : (অশ্রুভরা কণ্ঠে) জানি না।

সব্যসাচী : রতনবাবুর ঘাটে সুপ্রিয়র লাশ ভাসতে দেখেছিলাম। (বিড়বিড় করে) মুখটা থ্যাঁতলানো। চেনা যায় না। মারা যাওয়ার দু'দিন আগে সুপ্রিয় আমাকে বলেছিল, চিন্তা করো না কমরেড, আমাদের প্রতিটা রক্তবিন্দু আগামী দিনটাকে একটু-একটু করে পাল্টে দেবে। বদলে দেবে। অ্যাঁ, রাজলক্ষ্মী, এটাই সেই বদল তো?

                                            - ব্রাত্য বসু লিখিত 'উইঙ্কল্ টুইঙ্কল্' নাটকের অংশ

প্রতীক উর রহমান সব্যসাচী সেন হতে পারতেন। কিন্তু হয়ত আর হবেন না। হয়ত তিনি কলজে থাকতে চিনে নিয়েছেন উল্লিখিত নাটকের সনৎদের। আর সেই কারণেই পরাজিত, জর্জরিত একটি বামপন্থী দলকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছেন তিনি। কোন দলে তিনি যাবেন, তা সময় বলবে। কিন্তু, সংসদীয় বামপন্থী রাজনীতিকে আশ্চর্য সংকটের আলোয় কান ধরে এনে ফেলেছেন তিনি। কেউ বুঝতে পারছে না, এই সংকটের শুরু কোথায়, কোথায় শেষ। কারণ, আদর্শের গোড়া ধরে টান দিয়েছেন তিনি। প্রতীক উরের মতো লড়াকু নেতা, প্রথম সারির যুব নেতা, যাঁর মধ্যে সময়ের ধুলো পড়েনি, আদর্শের দৌড়ে  ক্লান্ত হওয়ার অ্যালার্ম বাজেনি যাঁর, তিনি কেন দল ছেড়ে দিচ্ছেন। যাঁদের দিকে তাকিয়ে আগে আগামীর সংসদীয় বাম রাজনীতি, তেমন একটা মানুষ কেন দল ছেড়ে দিচ্ছেন? যদি করেন, তবে কেন পক্ষ বদল করছেন প্রতীক উর! আদর্শের ট্যাবলেট আর কাজ করছে না তবে? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বামপন্থী দলের সঙ্গে দক্ষিণপন্থী দলের আর কোনও দলের ফারাক থাকছে না? 

কোনও এক প্রশান্ত বিকেলে হঠাৎই হোয়াটস অ্যাপ ফেরত চিঠির ছবি তোলপাড় করে দিল মিডিয়া। শুধু দল ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে বিষয়টা নির্দিষ্ট থাকলে তাও কথা ছিল, কিন্তু তা গড়িয়ে গেল অন্য দলে যাওয়া প্রসঙ্গেও। এবং অন্য দল মানে একেবারে তৃণমূলে। সে কথার সত্যি-মিথ্যা কেউই যাচাই করেনি। এখনও নিশ্চিত করে তিনি কিছু জানাননি প্রতীক উর। কোনও দল থেকেও কিছু জানানো হয়নি। এখনও পার্টি থেকেও বহিস্কার করা হয়নি তাঁকে। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নানা কথা রটেছে, সেখানে বলে দেওয়া হচ্ছে দিনক্ষণ, কবে, কোথায় তিনি তৃণমূলের পতাকা হাতে তুলে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে সংবাদমাধ্যম এখন প্রতীক উর-ময়। এই ঘটনা পরম্পরার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ধরা দিচ্ছে এক আশ্চর্য রূপ। মনে হচ্ছে, ২০১১ বাবা তৎপরবর্তী সময়, যখনও এ রাজ্যে বিজেপির রমরমা হয়নি, তখনকার সময় ফিরে এসেছে।  টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম দেখলে মনে হচ্ছে, মিডিয়া দীর্ঘদিন পর বিজেপি-তৃণমূলের বাইনারি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। বিজেপির স্ক্রিন টাইম কমেছে অনেকটা। সাংবাদিকরা আতিপাতি করে খুঁজছেন সিপিএমের বাম যুব নেতা-নেত্রীরা কী বলছেন, কখন সেলিম প্রতিক্রিয়া দেবেন, কখন প্রতীক উর-কে নিয়ে তৃণমূলের তরফ থেকে কিছু বলা হবে কী না। টেনিসের মাঠের দর্শকের মতো বসে বল এদিক থেকে ওদিক যাওয়া দেখা ছাড়া, এক্ষেত্রে বিজেপির আর কিছুই করার নেই। মনে হচ্ছে, রাজনীতিতে শেষ কয়েকদিনে আদর্শ শব্দটা যতবার উচ্চারিত হয়েছে, বেশ কয়েকবছর ততটা হয়নি। মনে হচ্ছে, বিজেপির রাজনৈতিক ন্যারেটিভের বাইরে হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছে রাজ্যের রাজনীতির মূল স্ত্রোত। মিডিয়ার আলো কিন্তু শুধুই সেইদিকে রয়েছে। 

কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? কেন প্রতীক উরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র যুব নেতৃত্ব দল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন। সিপিএমের অন্দরেই এর নানারকম ব্যখ্যা ঘুরে বেড়াচ্ছে। নাম না করে কোনও কোনও জাতীয় বা রাজ্যস্তরের নেতৃত্ব ব্যক্তিগত স্তরে বলছেন, প্রতীক উরের আর কিছু করার তো ছিল না। তিনি আট হাজার টাকার হোলটাইমার। লড়াকু নেতা। নিজে তৃণমূলের দোর্দণ্ড প্রতাপের উল্টোদিকে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন। স্ত্রীও দাঁড়াচ্ছেন ভোটে। শাসকদলের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁরা রাজনীতি করছেন। কিন্তু দিন শেষে ওদেরই চেপে দেওয়ার চেষ্টা করছে দলেরই এক বৃত্তের নেতৃত্ব। দলের অন্দরে বিভাজন স্পষ্ট হলেও, প্রকাশ্যে কোনও নেতা নাম না করেও বলতে রাজি নন, মহম্মদ সেলিম না সুজন চক্রবর্তী, কারা এই ঘোঁট পাকানোর ফলে প্রতীক উরের অব্যাহতি চাওয়া। কিন্তু তাঁরা একবাক্যে একথা স্বীকার করেছেন, উচ্চবর্ণের হিন্দু, ব্রাহ্মণ বা শহরবাসী, উচ্চশিক্ষিত পয়সাআলা লোকেরা ছাড়া সিপিএমের উচ্চ নেতৃত্বই পরবর্তী প্রজন্মকে তুলে আনছে না। যাদের পারিবারিক সম্পদ, টাকা পয়সা, বাড়ি-গাড়ি আছে, তাঁরাই পার্টির নেতৃত্বে থাকতে পারবেন, এমনটাই যেন অলিখিত শর্ত। কারণ, তাঁরা কখনও হোলটাইমারের প্রাপ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না, কেউ বলবেন না, এই বাজারে আট হাজার টাকায় সংসার চালানো যায় না। বরং একজন বাম নেতা সাংবাদিকদের কাছে সাফাই দেবেন, গাড়িটা তাঁর বাবা কিনে দিয়েছেন, তিনি কেনেননি। তারপরেও আটহাজারি হোলটাইমারকে কোনওদিন টেলিভিশনে পাঠানো হবে না, কোনওদিন সাংবাদিক ভিড় করবে না, কোনওদিন তাঁকে সামান্যতম জয়ের আশা আছে, এমন কোনও আসনে প্রার্থী করা হবে না। কী আশা করে এই পার্টি! 


সম্প্রতি একটি চ্যানেলে বিমান বসু বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। পার্টি অফিসের ছাদে বাগানের গাছে জল দিতে আজও ভোলেননা তিনি। আজ পর্যন্ত কোনও সিনেমার প্রিমিয়ারে তাঁকে বাংলা ছবির তৃতীয় শ্রেণির নির্দেশকের পায়ের কাছে বসে থাকতে দেখা যায়নি। বরং তিনি আজন্মকাল ঘুরে বেড়িয়েছেন মাঠে-ঘাটে। তার কাছে এসে ধরা দিয়েছে পার্টি অফিসের সিঁড়ি, ঘুলঘুলিতে বসা পায়রা, বর্ষাকালের জলের শব্দ, ভেঙে পড়া কমরেডের দীর্ঘশ্বাস। একে-একে চলে যাওয়া সমসাময়িক ও অগ্রজ বাম নেতৃত্বের দেহের সামনে দাঁড়িয়ে রেড স্যালুটের মাঝে তাঁর চোখও কি কখনও ঝাপসা হয়ে আসে না? তার কথা কেউ শোনে আর পার্টিতে? তিনি জানতেন মহম্মদ সেলিম হুমায়ুম কবীরের মন বুঝতে যাচ্ছেন? তিনি জানতেন রাজ্য কমিটির গ্রুপ থেকে পার্টির জরুরি ডকুমেন্ট প্রকাশ্যে কেউ বা কারা বার করে আনছে! ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে থেকে যাঁরা জীবনের বেশিরভাগটা উপভোগ করে কাটিয়ে দিলেন, সেই মধ্যবয়স্ক নেতৃত্বরা যা করেন, তা বিমান বসু বা প্রতীক উর-রা জানেন? জানি না। ও না, এখন তো তাঁর কাজ পার্টি অফিসের ছাদের গাছের পরিচর্যা করা, বিষন্ন বিকেলে পার্টি অফিসের নিজের ঘরে বসে বই পড়া বা কখনও কখনও এদিক-ওদিক গল্প করা। আর পিতামহের মতো সহ্য করা সমস্ত তাঁদুড়েপনা।   বিমান বসু আর প্রতীক উরকে ইন্দ্র আর সব্যসাচীর মতো মুখোমুখি বসিয়ে দিলে যৌবনের বিমানকে প্রতীক উর হয়ত বলতেন, 

'দেখুন সব্যসাচী, তিরিশ বছর পর আপনার দুনিয়াটা এইভাবে পালটে গেছে। মাথায় কোনও ছাতা নেই, পাশে কোনও শিবির নেই, সঙ্গে কোনও মিছিল নেই - আপনি এখন একা। পুরোপুরি একা ... পক্ষ নিন সব্যসাচী, পক্ষ, কোনও না কোনও পক্ষ আপনাকে নিতেই হবে।'

- ব্রাত্য বসু লিখিত 'উইঙ্কল্ টুইঙ্কল্' নাটকের অংশ