অপার অরণ্য
দল মতহীন বিবিধ দুঃখ— যার পেনশন ভাতা নেই, শুক্রবারের ক্ষুদা নেই, তলপেটে জ্বর,
কাঁচনদীতে গৃহপোষ্য মাছের আহারে জীবন!
আগলে রাখা বুকশেলফে লোডশেডিং—
এইসব ভাড়াটিয়া দুঃখের নিজস্ব ঘর নেই
ছবি-ছায়া-রোদ নেই, হাতের রেখায় ভোট নেই ন্যাশনাল আইডি কার্ড নেই
গোলাপমুখর চিঠি নেই, নেই প্রিয়তম গান।
শোকের নকশায় নিঃসঙ্গতা ধ্রুব। যেদিন প্রিয় আঙুল থেকে খসে গেল ভ্রম্রাণ্ড—
স্বপ্ন হত্যার রঙে উল্টে গেলো ক্যানভাস।
একটা কমলারঙ সূর্য উঠবে বলে
জীবনের নকশীকাঁথায় গোল গোল ফুঁটো হয়ে যায়..
এইভাবে দুঃখের চিতায় ফোটে বিরল ফুল। ছাই পেলে বেড়ে ওঠে নীলমণিলতা। সেই
লাবণ্যে ঝলমল কান্নার বেফাঁস রং।
দুঃখাহত হৃদয় যেন বিশুদ্ধ কারবালা, অনর্থক ঐশ্বর্য নিয়ে তীর্থ-পোড়াবাড়ি।
অতলে ঝাপ দিলে নষ্ট জমিতে ফলে উৎকৃষ্ট ঘাস।
আহা ঘাস! সবুজ সাফল্যে ঢেকে রাখে কীটদষ্ট মাটির আঘাত। শ্রীবর্ধন এই
আয়ুর্বেদিক টোটকা আমাকে শেখালো দুঃখ, হে মহান দুঃখ।
২.
বিষণ্ণ তসবির জপমালা
.....................................
১.
দুই একে দুই টান নিশ্চিহ্ন হলে পাথরশোকে হৃদযন্ত্র। সারসের ডানালোকে
চৌচির মেঘ! জাহাজঘাট শূন্য।
জলজ ডেরায় ডুবে বৃহন্নলা পঙ্কজ। পাতা ও পালক মুখোমুখি অচ্ছুৎ। অকারণ
প্রস্তাবে এড়িয়ে যায় সমুদ্রশৈবাল। চোখেচোখে পালায় কথা। নৌকাডুবি।
তাহলে কি পঁচন ধরবে গানে? স্বপ্নশূন্য ঘুমের কোন মানে নেই। আঙুল দুটি
ফিরতে চায় নামতাস্মৃতির টানে..
২.
মেয়েটি শুয়ে আছে ঘুমের আকার। আসন্ন সন্ধ্যাদীপে সলতে নেই। আকাশমণি নিভে
গেলে ঠোঁটের কাছে ফেলে আসা চুমুটি জ্বলবে।
ধুপগন্ধের ভেতর কে তাকে জাগাবে ফের?
কে তার অনুপ্ত মুদ্রায় তুলে দেবে স্পর্শের কাঁপন? নির্বিকার নাচঘরের সাজ
ধীর চোখে কাজল পরাও ঘুঙুরদেবী
আমরা বেতাল ভৌমিক নর্তকীর নাচ দেখতে চাই
৩.
পরাহত কুসুম, কুসুমপেলব ঘর। ঘর বলতে চৌতাল গিঁট। কবেকার সন্ধ্যা খুলে নিজেকে হারাই।
নিয়ে গেছো রুয়েলিয়া ফুলের দেশে ছায়াটি আমার। এখন স্নানঘরে সাবান মাখে দেহ।
বন্ধ কপাটের ফাঁকফোকর খতিয়ে পাবে অনেকগুলো উপোস। অনেকদিন নেই কোন
বৃহস্পতিবার। গোপন তৃষ্ণার অভিযোগে মনঃকষ্ট বাড়াও।
হৃদয়ের আঁচে পুড়িয়ে নিচ্ছ এক হাত মায়া।
বলিনি নিভাও— পুড়ছে হাড়গোড় যাবজ্জীবন। তোমাকে বলেছি যাও— আমি নেই আমার কোথাও!
৪.
ছিলাম কুয়োতলার ব্যাং, তুমি এসে বাজালে সরোদ।
ছিলাম শূন্যপক্ষ আতুরঘরের শুকনো দেয়াল।
তুলিতে জমালে রঙ। ছিলাম ছেড়া রুমাল, দিকভ্রান্ত হাওয়া। মুছে নিলে তোমার
অবসন্ন কপালের ঘাম।
এখন আমাদের রাত-দিন একা একা, অলস অবসর। ড্রয়ারে কাঁদছে স্মৃতিসমৃদ্ধ
জামা। ভোরে তোমার জামার থেকে স্বপ্নগন্ধ আসছে।
ও জামা, বোতাম লাগাও।
একঠ্যাংয়া বক— আমি কুলাতে পারি না যে!
৫.
সে এসেও শেখালো তাই, জানতাম ঘুম মানে ক্ষয়। বিনিদ্র জামরুদ তার চোখের মত
অতটা নয়। কয়েকটি রাত জোড়া দিয়ে লাল হয়ে থাকত সে পাশে। আমরা মনে মনে শুয়ে
শুয়ে বহুদিক যেতাম। যেতে যেতে যানজট বিচ্ছিন্ন দ্বীপে হতো দেখা।
বিচ্ছিন্ন হতে হতে দ্বীপ মুছে ফেরা। ফিরে এসে ঘুমাই। ঘুম বুঝি
চোরাস্রোতের ভ্রম, অতকিছু মনে রাখে না।
অসীম ঘুম যাবতীয় সুখশান্তির মোড়ক।
সেই ঘুমের ভেতর পরাঙ্মুখ দুঃখগুলো মরে যায়।
ভাবছি— এই জেনে, এখন কালঘুম ভালো লাগবে!
৬.
তার জলপাইবাগান পছন্দ কিনা জানি না। আমার তার বুকের কুসুম। এইখানে খেলা
করে চিত্রাহরিণ ছায়া, অগণন মৌসুমী পাখি। যেন চৈত্রেও মেঘজাত চোখের পুকুর।
তবু সে ভালোবাসত। আমি বাসতাম কিনা একথা জানা নেই।
টবের গাছে প্রথম ফল। ধুর ছাই সে দেখল না।
আমার বুকপকেটে তার ডাকনাম ব্যথা হয়ে উড়ে যায় চিল। ভাতের বাসন হাত থেকে ভেঙে পড়ে।
ও চিল, গিয়ে বোলোনা আবার তাকে মনে পড়ছে খুব!
৭.
চিরুনিতে হাত, আয়নায় মুখ লেগে আছে। চুল নখ ত্বক যেখানে ছুঁয়েছে আঙুল
সেখানেই ছবি। এই ছবি নিরেট অন্ধকার। অমিত হাওয়ায় দূরের শালবন কাত হয়ে
কাঁপে। আমাদের স্মৃতিতে বৃষ্টিচিহ্ন নেই। প্রখর শূন্যতা আছে। অপার
অনিদ্রা জুড়ে তোমার ঘ্রাণ ভাসে। লগ্নভ্রষ্ট হৃদয় জুড়ে পুষ্পগন্ধহীন এতো
হাওয়া কোথা থেকে যে আসে!
৮.
সে নির্দোষ সাম্পান। সুকৌশলে এড়িয়ে যায় পাপমগ্ন জল। আমি কুচকুচে জন্মান্ধ
বক। এক পায়ে দাঁড়ালেই ভেঙে যায় জলের কার্নিশ। অবিকল জলেরদামে জল কিনি।
তার জল লাগে ঢের উত্তাল। গতরে এঁকে দেই বইঠার গান। নিবিড় বুননে ঢেউমুখী
বাদাম উড়াই। বাদামের বিস্তার সুখে ঢেকে নেই অর-ঘট্ট মুখ। ভুলে যাই—কোনদিন
মাতাল সন্ধায় সেই উত্তাল সমুদ্র আমাদেরও ডেকেছিলো!
৯.
তার চুলগন্ধে মাতাল মধুকর ওড়াউড়ি করছে। শরীরখান বনপাতার চাদর হলো বুকের
ভিতর। ভিতরে পৌষালি ক্ষেত। ভাসছে মরুভূমি।
দ্যাখো প্লাবন সংকেত। এইখানে পুষি শীতকাল। এইখানে পাখিটাকে রাখি।
ও সখা, চিরসখা পাখি
এইখানে জলমুখ নতজানু থির হয়ে এসো,
বুক পেতে আকাশ বানিয়েছি, শুই?
১০.
চাঁদ-চন্দন ছড়িয়ে ডালিমের দানাদার ব্যথায়
একবার দুইফালি চিড়ে নেব রাত্রির আফিম। অর্কিডচোখ আরও শুকিয়ে গেলে আমাদের
তিলচুম্বনের কথা এভাবেই আড়াল হবে। মুছে যাবে জ্বরশীতে প্রলাপবাক্য। আমরা
আমাদের মত একবার সর্বনাশ একবার কলঙ্ক হবো।
একা একা, তারপর— ফিরে যাবো নিজস্বতায়।
অথচ এইকথা প্রেমিকের কাছে দণ্ডনীয় ক্ষতি।
৩.
পাঁজরে শীতার্ত শোক
..................................
নিঁখোজ শীতচিঠির ঠোঁটে জমছে বক পাখির শ্বাস
লুটপাট দুটি জানালার মধ্যস্থ হৃদয়বিন্যাস
আঙুলে আঙুল কাছাকাছি এসেও
কীভাবে শ্বাপদ হয়ে ওঠে চুম্বনসিক্ত জায়নামাজ
আহত অজ্ঞাত জানে হিমভোরের অভিধান
যেন তুমি মানেই শূন্যতার বিষ
চোখে ও চুলে চোখপলান্তি হাওয়ার বসবাস
বুকের বারান্দায় নিঃস্বঙ্গ নোঙর যদি ভাসে
জেনে নাও ফাঁরাক খাঁখাঁ চৈত্রপূর্ণিমা ও ফাগুনের বিস্তারিত মদ
সূর্যমুখী সুষমা ফুঁড়িয়ে যাবার আগেই
শরীরশাস্ত্র মুখস্ত করে এসো,
এসো কিন্তু প্রিয়।
এই অন্ধকারঘন ভোর, বোবা ব্যথা,
চোখের গোল নৈঃশব্দ পুকুর, সমুদ্র সন্ন্যাস
নিঃসঙ্গা নিমগ্ন ঘুঘুদের বিরহ যতটা ভালো লাগে—
মানুষকে আর ততটা ভালো লাগে না!
প্রকোষ্ঠের সুখ ও সন্ধ্যার মাঝে আমি হই দীর্ঘ অসুখ
পুরাণোক্ত আয়ুরেখা না-ছুঁয়ে ফিরে আসে তাকে
আকাশ অধিকার ঘিরে উড়ে যায় পাখি
আজন্ম অচ্ছুৎ, আদরে পুষি পতঙ্গবৃত্তি
ছাই-রঙা মেঘফুল বৃষ্টির দাগ
ভালো আছি ভালো নেই
তাতে তোমাদের কী?
৪.
পাগলের সাথে আকাশগঙ্গা
.........................................
মহাশূন্যের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ঘুরেফিরে কতক পাগলের সঙ্গে দেখা
দীর্ঘ একবার তাকাই ঘুণকাটা জীবনের দিকে
তারপর পৃথিবীর আদিম পাগলামি রাত—
ভোর অব্দি ছুঁড়ে দেই পিতামাতার বালিশের কার্নিশে।
কেননা আমরা নক্ষত্রের সন্তান
এ কথার সূত্রে সেদিন প্রথমবার উপলব্ধি করলাম
যতই লোডশেডিং হোক এরা'ই শহরের ল্যাম্বপোস্ট হয়ে জ্বলবে
কেননা আদিপিতা আমাদের মাটির পিদিম
শূন্যের অরস মাটিতে ঘাস হয়ে জন্মাবার স্বাদ জাগে, নক্ষত্রের দেশে—
আকাশগঙ্গা ছায়াপথে
যদিও আমার এই নিঃসন্তান আর্তি একটি বেখাপ্পা প্রলাপ ছাড়া কিছুই নয় জানি
৫.
অ্যালগরিদম
.......................
বিমূর্ত আসমান ফণা তুলে কণ্ঠস্বর পৌঁছে গেলে
এমনই হবার কথা। যেরকম ছায়ার পাশে
মরে থাকে স্মৃতির কঙ্কাল, বোবা হাত তাকে না-ছোঁয়
ঝুড়িঝুড়ি বসন্তে।
শিকারী চোখতলে তখনও সজাগ
চকমক করা একখণ্ড জল
চুপসে যাওয়া আহত শামুকের শোকে!
হৃদয় চিরহরিৎ কাঠবাগান। সেইখানে প্রচণ্ডমূর্তি হয়ে
অতীত এবং আপেলের অবগাহনের আলপথ।
হেঁটে যেতেই ইচ্ছে করে,
ইচ্ছে তো করেই আদম ও হাওয়ার মত— উৎসব আর
আতসবাজি নিয়ে আদীম পাপ ও পুণ্যের ভেতর
শারদসন্ধ্যাগুলো ছু্ঁয়ে যাই।
এই দীঘল সত্যের যবনিকা থেকে ঠোঁট মেলে উড়ে যায় মহাপৃথিবীর প্রস্থান
বাহুল্যসূত্র ছাড়াই অত্যাসক্ত দ্বিধাহীন প্রেমিক
প্রেমিকার ঢেউময় ঝাউবন থেকে
একঝংকারে খুলে নিতে পারে শতসহস্র বোবাশাড়ি...
কাঁপছে কাঁপুক থরথর বাতাসের স্বর
----------------------------------------------------
জেগে থাকার বীজধান
ওবায়েদ আকাশ
একদিন হাঁটতে হাঁটতে
পথনির্দেশিকা ছাড়াই পৌঁছে গেলাম আসানসোলে
দুতিন রাত্রি লেগে গেল, সারাপথের ক্লান্তি
বড় বড় প্রকৃতির শোভা দুহাতে মাড়িয়ে যাচ্ছিÑ
কোথাও চুপচাপ আগুন, কোথাও জলোচ্ছ্বাস...
সাঁতরে পার হচ্ছি আগুন এবং লাফিয়ে জলোচ্ছ্বাস
নজরুলকে ফজরের আগেই ডেকে তুলতে হবে
[কেননা, যে কোনো মহাকল্পনা ভোররাতের অতটুকু অন্ধকার ব্যতীত প্রায়শ অপূর্ণ থাকে]
অথচ আমরা পৌঁছানোর অন্তত দুরাত্রি আগেই জেগে বসে আছেন কবি
ভাবলাম, প্রতিদিন ভোরে চারাধান রোপণের আগে কবির কাছ থেকে শেখা জেগে থাকার পদ্ধতি মুঠি মুঠি ছড়িয়ে আসবো অপর ভূমিতেও
সঘন শালবন পেরিয়ে, আততায়ী, ডাকাতের ভয় উজিয়ে আসানসোল আজো নগরের মর্যাদা পেল না
অথচ পাহাড়ে উঠলে বোঝা যায় আসানসোলের প্রতিটি তৃণ ঈশ্বরের মতো কতটা প্রাজ্ঞ এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বি
