প্রতীক্ষা ঘোষ: বৃদ্ধ পঞ্চানন কর্মকার, মৃত্যুর অল্প আগে এসে দর্শকদের গল্প বলছেন। নিজের গল্প। মঞ্চে জন্ম হচ্ছে। একটা হাতুড়ির জন্ম। নাড়ি কাটা হয়। বাবা আদর করেন। ছোট ছেলের নাম রাখেন পঞ্চানন। অবাক হওয়ার সেই শুরু। শিল্পীর জন্মই যেন তাঁর শিল্পের জন্যই। হাতুড়ির জন্ম, আত্মপরিচয় নিয়ে পঞ্চাননের জন্মের কথা বলে। এমন এক শিল্পী যাঁর হাত ধরে বাংলা হরফ ছাপার অক্ষরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়। চার্লস উইলকিন্স বাংলা ব্যাকরণ ছাপার সময়ে পঞ্চানন কর্মকারের সহায়তা নেন। প্রতিটি অক্ষর তিনি নিজে হাতে তৈরি করেন। সেই সৃষ্টির মুহূর্তে মঞ্চ হয়ে ওঠে এক প্রেমময় কবিতার মতো। কয়েকজন কর্মকার মিলে তালে তালে লোহা পেটাচ্ছেন। ধীরে ধীরে গান, তাল মিলে মিশে হৃদস্পন্দনের মতো ধ্বনিত হতে থাকল প্রেক্ষাগৃহে। যেন বাংলার হরফে ছেপে যাচ্ছে পঞ্চাননের হৃদস্পন্দন। বাংলা হরফের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি মাত্রা যেন সেই হৃদস্পন্দনের ফল। শুভঙ্কর দের আলোর কাজ এখানে উল্লেখযোগ্য। গোটা মঞ্চ আলোয় ভেসে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ অন্ধকার। সেই অন্ধকারে কেবল পঞ্চাননের উপর লাল আলো। লাল - রক্ত, আগুন, বিপ্লব, সৃষ্টির উত্তাপ…
যখন সমস্ত হরফ তৈরি হল, ছাপাখানায় গেল, তখন শিল্পীর চিরন্তন আশঙ্কা ঘিরে ধরল তাঁকে। স্ত্রীকে আশঙ্কা জানান। “যদি আমার হরফগুলো আমার সঙ্গে প্রতারণা করে।” সৃষ্টি একবার পৃথিবীতে ছেড়ে দিলে তা আর শিল্পীর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সৃষ্টি তখন ক্ষমতার হাতেও যেতে পারে, বিকৃত হতে পারে, ভুল ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হতে পারে। শিল্পী তার সৃষ্টিকে সন্তান ভাবেন, কিন্তু সন্তান একদিন নিজস্ব জীবন বেছে নেয়। এই ভয় তাই পিতৃত্বেরও, শিল্পীরও।

তবে হরফ তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেনি। করেছিলেন চার্লস উইলকিন্স। গ্রাম থেকে শহরে পায়ে হেঁটে আসছেন পঞ্চানন। ছেঁড়া ছাতার ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ছে। মুষলধারের বৃষ্টিতে কাক ভেজা ভিজে, ছাপাখানায় পৌঁছন তিনি। শুধু শিল্পের তাড়নায়, সৃষ্টির আকর্ষণে। ছেঁড়া ছাতার মতো সুরক্ষার ভঙ্গুরতা মাথায় করেই শিল্পীর পথ চলা, এ তো ইতিহাসের চেনা ছবি। কোনও নিশ্চিত আশ্রয় নেই, কোনও পৃষ্ঠপোষকতার ছাদ নেই। তবু শিল্পীরা থামেন না। পঞ্চাননও থামেননি। থরথর করে জ্বরের ঘোরে, ঠাঁয় দাঁড়িয়ে দেখেন, তাঁর তৈরি হরফেরা কীভাবে বাংলা ব্যাকরণকে ছেপে দিচ্ছে সাদা পাতায়। কী ভীষণ তৃপ্তি সে দুটো জ্বর মাখা চোখে। স্রষ্টার আনন্দ তো সৃষ্টিতেই। কিন্তু, সব শেষে যখন বইটা ছেপে বের হল, তখন সকলের নাম থাকলেও, বাদ পড়ল পঞ্চানন কর্মকারের নাম। বেজে উঠল, ‘এখনও সে বৃন্দাবনে’ গানটি। যেন শিল্পী নিজে রাধা। আর শিল্প যেন তাঁর কৃষ্ণ। কৃষ্ণ যেমন অধরা, শিল্পও তেমনই। নিজের সৃষ্টিতে নিজের নামও তেমনই।
অভিমান হয়েছিল বৈকী! কিন্তু শিল্পী তো… উইলিয়াম কেরি যখন হরফের কাজের জন্য ডাক পাঠালেন, তখন ১৯ বছর ধরা করা ইংরেজদের চাকরি ছেড়ে, অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে হাজির হন শ্রীরামপুরে। তখন শিল্পী ৫০ এর ঘর টপকে ফেলেছেন। কিন্তু শিল্পের খিদে, নতুন সৃষ্টির অদম্য ইচ্ছা, বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখায় সহজেই। সৃষ্টি হয়, শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ইতিহাস।
রজত চক্রবর্তীর লেখা উপন্যাস থেকে, নির্দেশক দেবাশিস নাটকটি তৈরী করার সময়ে মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন অসাধারণ ভাবে। মঞ্চের মাথায় আড়াআড়ি ভাবে টাঙিয়ে রেখেছেন দুটি শাড়ি। যেন, মায়ের ভাষা, মায়ের আঁচলেরই সমান। যখন ইংরেজি গান, বাংলার দোতারা-বাঁশিতে মিলে মিশে শিল্পের কাঁটাতারকে চুরমার করে দেয়, তখন যন্ত্রানুসঙ্গে অনুভব সেনগুপ্ত, ঋদ্ধিবেশ ভট্টাচার্য, সৌম্যজিৎ দাস, ভাস্কর বনিক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
সব শেষে, নাটকটি মনে করিয়ে দেয়—ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়, শ্রমের ফল। শিল্প কেবল সৌন্দর্য নয়, সংগ্রামের ফল। আর শিল্পী—তিনি চিরকালই এক ভিজে পথের পথিক, এক কাগজের নৌকো, এক অধরা বৃন্দাবনের রাধা। পঞ্চাননের জীবন এখানে কোনও রূপকথা নয়, কোনও অতিনাটকীয় মিথ নয়। তার জন্ম, শ্রম, ভয়, ক্লান্তি—সবটাই শরীরী, বাস্তব, ঘামে-ভেজা। হাতুড়ির আঘাত যেমন আক্ষরিক, তেমনি ভাষার জন্মও আক্ষরিক। এই নাটক কল্পনার ভাষায় ইতিহাসকে ধরেনি। ইতিহাসকে ঘাম, রক্ত, শব্দের আঘাতে অনুভব করিয়েছে। অক্ষরের জন্ম এখানে দৃশ্যমান। আসলে অনীক প্রযোজিত নাটক “আক্ষরিক” সময়ের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা এক উত্তরাধিকারকেও চিহ্নিত করে।
