সৌরভ গোস্বামী: কলকাতা কোনও মধ্যযুগীয় শহর নয়, এতে মোগল আমলের ছাপও তেমন নেই। এই মহানগরী মূলত একটি ঔপনিবেশিক জনপদ। তবে বিশ্বের অন্য যে কোনও প্রান্তের বাণিজ্যনগরীর মতোই, কলকাতার বুকেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছে বহু গণিকালয়। কেমন ছিল এই নিষিদ্ধ পল্লীগুলোর শুরুর দিনগুলো? কীভাবে গড়ে উঠেছিল তারা, আর এর পিছনের সমাজতাত্ত্বিক কারণই বা কী ছিল? তথাকথিত ভদ্র সমাজের তৈরি করে দেওয়া শুধুই কি কালো অন্ধকার লুকিয়ে আছে এই গলির বাঁকে বাঁকে? নাকি এর মধ্যেও রয়েছে এক রূপান্তরের আলো? কলকাতার যৌনপল্লী এবং তার বাসিন্দাদের দীর্ঘ জীবনযুদ্ধের ইতিহাস ও বর্তমান চালচিত্র নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
বাবু কালচার ও কলকাতার প্রথম যৌনপল্লী
কলকাতায় যৌনপল্লীর সংখ্যা অনেক। উত্তর থেকে দক্ষিণ— এই শহরের বিভিন্ন গণিকালয়ে বর্তমানে প্রায় লক্ষ যৌনকর্মী কাজ করেন। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, প্রাচীন কলকাতার মূলত দুটি প্রধান রাস্তার ধারে এই সব যৌনপল্লী গড়ে উঠেছিল। প্রথমটি হল চিতপুর থেকে কালীঘাটগামী রাস্তা, আর দ্বিতীয়টি লালদিঘি থেকে বউবাজারগামী রাস্তা। এছাড়া খিদিরপুর গড়ে উঠেছিল বন্দরের নাবিকদের জন্য এবং জানবাজার অঞ্চলটি তৈরি হয়েছিল ইংরেজদের ‘আপ্যায়নের’ উদ্দেশ্যে।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, পূর্বে কর্নওয়ালিস স্ট্রিট (বর্তমান বিধান সরণি) এবং পশ্চিমে চিতপুরের মাঝের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে পতিতাদের এই উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। আর এই নিষিদ্ধ পল্লী স্থাপনের পিছনে জড়িয়ে রয়েছে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ইতিহাস ও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাম। উনিশ শতকে তৎকালীন বাঙালি ‘বাবু’দের একাধিক উপপত্নী রাখাটা ছিল একটা সামাজিক আভিজাত্য বা “বাবু কালচার”। কিন্তু ঘরে বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে উপপত্নীকে রাখা সম্ভব ছিল না। সেকালের বাবুদের এই ‘সমস্যা’ দূর করতেই দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে বর্তমান ‘সোনাগাছি’ অঞ্চলে উপপত্নীদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী এবং সুমিতেন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ঠাকুরবাড়ির জানা অজানা' বই থেকে জানা যায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এই অঞ্চলের প্রায় ৪৩টি বেশ্যালয়ের মালিক ছিলেন।
তবে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের সন্তানদের সংগঠন 'আমরা পদাতিকে'র অ্যাডভোকেসি অফিসার মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায় এই বিষয়টিকে ভিন্ন নজরে দেখেন। তাঁর মতে, তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশদের নজরে বাংলার কোনও সুন্দরী মহিলা পড়লে তাঁরা সাহেবদের ভোগের শিকার হতেন। এর পর সমাজ বা পরিবার সেই নারীদের আর ফিরিয়ে নিত না। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর সেই সমস্ত অসহায় নারীদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং এভাবেই এই বিস্তীর্ণ এলাকায় যৌন ব্যবসার পরিধি বাড়ে।
পুরনো দলিল অনুযায়ী, ১৮৫৩ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় কলকাতায় বারবনিতাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২,০০০ এবং বাড়ির সংখ্যা ছিল সাড়ে চার হাজারের বেশি। ১৮৬৭ সালে সেই যৌনকর্মীদের সংখ্যা একলাফে দাঁড়ায় ৩০,০০০-এ। ১৮৬২ সালে নগরকথক কালীপ্রসন্ন সিংহ তাঁর ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-য় লিখেছিলেন, “বেশ্যাবাজিটা আজকাল এই শহরে বাহাদুরের কাজ ও বড়মানুষের এলবাত পোশাকের মধ্যে গণ্য... কলকাতা শহর এই মহাপুরুষদের জন্য বেশ্যাশহর হয়ে পড়েচে।”
মন্বন্তর থেকে স্বাধীনতা সংগ্রাম: ইতিহাসের মোড়
উনিশ শতকের শেষার্ধে বাংলার গ্রামাঞ্চলে বিধ্বংসী মন্বন্তরের ফলে ভিটেমাটি হারানো হাজার হাজার গ্রামীণ নারী কলকাতায় ভিড় জমান এবং নিরুপায় হয়ে এই পেশা বেছে নেন। ১৮৭২ সালের এক সরকারি বিবরণী থেকে জানা যায়, প্রথম দিকে এই পেশায় অন্ত্যজ শ্রেণির প্রবেশ না থাকলেও, পরবর্তী সময়ে উদ্ধার হওয়া যৌনকর্মীদের অধিকাংশই ছিলেন তাঁতি, মালি, যোগী, কুমোর, কামার, চামার, সোনার বেনে ও তেলি সম্প্রদায়ভুক্ত।
পরবর্তীকালে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই বারবনিতারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এবং জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী সোনাগাছির বারবনিতাদের নিয়ে সভা করেন। দেশের জন্য মাত্র কয়েক দিনেই এই নারীরা ১ লক্ষ টাকারও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। মনাদা দেবীর লেখা বই থেকে জানা যায়, তাঁরা ‘পতিতা সমিতি’ গঠন করে লালপাড় শাড়ি ও কপালে সিঁদুরের ফোঁটা লাগিয়ে গান গেয়ে বন্যার্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ১৯২৪ সালে চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে তারকেশ্বর সত্যাগ্রহেও তাঁরা অংশ নেন, যদিও তৎকালীন ‘ভদ্র সমাজ’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকা এর তীব্র সমালোচনা করেছিল। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধুর প্রয়াণের পর তাঁর বিশাল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মিছিলেও পা মিলিয়েছিলেন এই অবহেলিত নারীরা।
‘বেশ্যা’ নয়, ‘যৌনকর্মী’: দুর্বার ও ঊষা সমবায়ের বিপ্লব
১৯৯৫ সালে কলকাতার অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ-এর বিজ্ঞানী ডঃ স্মরজিৎ জানা মাত্র ১২ জন যৌনকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’ (DMSC)। তাঁরাই প্রথম সমাজকে বোঝান যে এঁরা কেউ পতিতা বা বেশ্যা নন, এঁরা হলেন ‘যৌনকর্মী’। এই ‘যৌনকর্মী’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন আমেরিকার সমাজকর্মী ক্যারল লেই (Carol Leigh)। ২০১২ সালের মধ্যে দুর্বারের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৫ হাজার। গত আড়াই দশক ধরে যৌনকর্মীদের অধিকার ও স্বাস্থ্য নিয়ে লড়াই করছে এই সংগঠন। বর্তমানে নারী পাচার রোধের নামে আসা একটি নতুন বিলের তীব্র বিরোধিতা করছে দুর্বার, কারণ তাঁদের মতে এই বিলটি ১৮৬৮ সালের ব্রিটিশ আমলের দমনমূলক ‘চোদ্দ আইন’-এর শামিল।
যৌনকর্মীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ১৯৯৫ সালের ২১ জুন মাত্র ১৩ জন সদস্য নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘ঊষা মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ’। আজ এর সদস্য সংখ্যা ৩৬,৭৩২ এবং বার্ষিক টার্নওভার ২৭.৫ কোটি টাকা। একসময় আমলারা ‘নৈতিক চরিত্রের’ দোহাই দিয়ে যৌনকর্মীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলতে বাধা দিয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন মন্ত্রী সরল দেব বিধানসভায় আইন সংশোধন করে ‘ঊষা’ তৈরির পথ সুগম করেন। ২০১৭ সালে সমবায় দপ্তর এটিকে পুরস্কৃত করে, যা ছিল এই পেশার নারীদের জন্য এক বিরাট সরকারি স্বীকৃতি। বর্তমানে এটি সমবায় ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার লড়াই চালাচ্ছে।
অন্ধকারের মাঝে আলোর দিশা: স্বশাসিত বোর্ড ও সন্তানদের সাফল্য
যৌনকর্মীরা নিজেরা এই পেশায় থাকলেও চান না তাঁদের সন্তান বা অন্য কোনও মেয়ে এই অন্ধকারে আসুক। এই উদ্দেশ্যে ২০০১ সালে গঠিত হয় যৌনকর্মীদের ‘স্বশাসিত বোর্ড’ (Self Regulatory Board)। সোনাগাছি, হাড়কাটা গলি বা কালীঘাটের মতো যৌনপল্লীতে নতুন কোনও মেয়ে এলেই এই বোর্ড নজরদারি চালায়। মেয়েটি নাবালিকা বা অনিচ্ছুক সাবালিকা হলে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ ও পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মহিলাকে (যার মধ্যে ১০০০ জন নাবালিকা) উদ্ধার করেছে এই বোর্ড। এই কাজ করতে গিয়ে সোনাগাছিতে এক প্রবীণ যৌনকর্মীকে খুনও হতে হয়েছে, তাও লড়াই থামেনি। সুপ্রিম কোর্টের প্যানেলও এই স্বশাসিত বোর্ডকে গোটা দেশের জন্য একটি মডেল করার সুপারিশ করেছে।
আজ যৌনকর্মীদের সন্তানরা আর নিজেদের পরিচয় লুকাতে চান না। তাঁরা সমাজের মূল স্রোতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। ২০১৩ সালে পোল্যান্ডে ‘হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপ’ ফুটবলে অংশ নিয়েছিল এই পল্লীর সন্তান বিশ্বজিৎ নন্দী ও সুরজিৎ ভট্টাচার্যরা। ১৬ বছরের রাজীব রায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সকার স্কুলে ট্রেনিংয়ের সুযোগ পেয়ে বিলেতের এজেন্টের সাথে চুক্তি সই করেছে। অন্যদিকে, যৌনকর্মীদের সন্তানদের সাংস্কৃতিক দল ‘কোমল গান্ধার’-এর তাঞ্জিলা, সঙ্গীতা, অভিজিৎরা পৌঁছে গেছে রিয়েলিটি শো-এর ফাইনালে। মে দিবসের প্ল্যাকার্ড বা দুর্গাপূজার থিম মেকার হিসেবে নাম কুড়াচ্ছেন রতন দলুইয়ের মতো যুবকেরা।
সোনাগাছি নামের আসল ইতিহাস
সবশেষে আসে ‘সোনাগাছি’ নামটির রহস্য। এশিয়ার বৃহত্তম এই যৌনপল্লীর নামের সাথে দেহব্যবসার কোনও ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই। এই নামটির উৎস আসলে এক সুফি সাধক। ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইরান থেকে বাংলায় এসেছিলেন হজরত সৈয়দ সানাউল্লাহ গাজি, যিনি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘সোনা পীর’ নামে পরিচিত ছিলেন। রবীন্দ্র সরণি সংলগ্ন সোনাগাছি স্ট্রিটের মুখে আজও এই সোনা পীরের মাজার রয়েছে, যা ৩০ কেজিরও বেশি রুপো দিয়ে মোড়ানো। প্রতি বছর জুন মাসে এখানে বিশাল ওরশ উৎসব হয়।
ইতিহাস গবেষকদের মতে, ব্রিটিশদের কলকাতা অধিগ্রহণের অনেক আগেই সোনা পীর ও তাঁর ভাইবোনেরা ভারতে আসেন। তাঁরই এক বোন রওশনারা বিবির মাজার রয়েছে বসিরহাটে, ভাই গোরাচাঁদের মাজার হাড়োয়াতে এবং গাজী মোবারকের মাজার রয়েছে ঘুটিয়ারিশরিফে। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আগে এই অঞ্চলটি মুসলিম অধ্যুষিত ছিল এবং সোনা পীরের নামানুসারেই এই রাস্তার নাম হয় সোনাগাছি। দাঙ্গার পর বহু মুসলিম পরিবার বাংলাদেশে চলে যান এবং এখানে হিন্দুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
সময়ের সাথে সাথে সোনাগাছির ভৌগোলিক ও সামাজিক রূপবদল হয়েছে। চার দেওয়ালের কোঠা ছাড়িয়ে অনেকে এখন রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু একই সাথে তথাকথিত ভদ্র সমাজের কপটতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজেদের অধিকার, শ্রমের মর্যাদা এবং সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য এই অন্ধকার গলি থেকেই প্রতিনিয়ত আলোর যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন হাজার হাজার যৌনকর্মী।















