এলাহাবাদ হাইকোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল—বিয়ে কোনওভাবেই শোষণের লাইসেন্স হতে পারে না। এক আইনজীবী স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণ নিয়ে মামলা করেছিলেন৷ আদালত সেই মামলা খারিজ করেছে৷ বিচারপতি বিনোদ দিওয়াকার এর বেঞ্চে এই মামলা চলছিল৷ মিথ্যা অজুহাতে হয়রানি করার জন্য এবং তাঁর স্ত্রীর ওপর “আর্থিক নির্যাতন” চালানোর অভিযোগে সংবিধানের ২২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী ১৫ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
বিয়ের পর অত্যাচার শুধু শারীরিক বা মানসিক হয় না৷ আর্থিক ক্ষেত্রেও মহিলারা বিয়ের পর অত্যাচারের শিকার হন৷ বিয়ে কোনভাবেই অত্যাচার করার ছাড়পত্র হতে পারে না, আদালতের এই রায়ে আশার আলো দেখছেন অত্যাচারিত মহিলারা৷
২০১৯ সালের ১৮ মে বিয়ে হয় এই দম্পতির৷ সেই সময় দুজনেই চাকরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন৷ কিছুদিন পরেই স্ত্রী সরকারি চাকরি পেয়ে যান৷ এলাহাবাদ হাই কোর্টে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সচিব ( অ্যাডিশনাল প্রাইভেট সেক্রেটারি) পদে চাকরি পান৷ মহিলার স্বামী আইন পাশ করলেও তখনও চাকরি পাননি৷ কিছুদিন পর থেকেই অশান্তি শুরু হয়৷ অশান্তি থেকে একাধিক মামলার সূত্রপাত৷ স্বামী ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৪৪ ধারার অধীনে ভরণপোষণ দাবি করে মামলা করেন৷
স্বামীর অভিযোগ, তাঁর নিজস্ব কোনও আয় নেই৷ মানসিক উদ্বেগ এবং আইনি সমস্যার কারণে তাঁর একাধিক শারীরিক সমস্যা হচ্ছে৷ তাই তিনি ভরণপোষণ চাইছেন৷ শুধু তাই নয়, স্ত্রী মিথ্যে এফআইআর করে তাঁকে ফাঁসাচ্ছেন, তাঁর কেরিয়ার নষ্ট করছেন এবং বিচ্ছেদ চেয়ে মামলা করেছেন স্ত্রী এমনটাও অভিযোগ করেন ভদ্রলোক৷ আইনি কারণে কোর্টে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাঁকে অনেক দূর যেতে হচ্ছে সেই কারণে তাঁর শরীর খারাপ করছে বলেও অভিযোগ করেন৷
স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবি সম্পূর্ণ অন্য একটি দিক উল্লেখ করেন৷ স্ত্রীর পক্ষের আইনজীবী জানান, মামলাকারী রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের৷ আইন পেশায় আসার আগে কন্ট্র্যাকটর ছিলেন৷ মামলাকারী মিথ্যেবাদী এবং মিথ্যে কথা বলে স্ত্রীর স্যালারি অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ লক্ষ টাকার দুটি ব্যক্তিগত লোন নিয়েছিলেন জমি কেনার নাম করে৷ এই টাকা তিনি বিলাসিতা করে আর মদ খেয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন৷
স্ত্রী আদালতে জানান, মামলাকারী স্বামীর কারণে প্রতি মাসে ২৬,০২০ টাকা ইএমআই দিতে হচ্ছে৷ এর সঙ্গে প্রতি মাসে হিন্দু বিবাহ রীতি মেনে ভরণপোষণ বাবদ প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে৷
আদালত এই আচরণকে “ইকনমিক অ্যাবিউজ” বা অর্থনৈতিক নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করে। বিচারপতি দিওয়াকার জানান, "দাম্পত্য সম্পর্কে নির্যাতন শুধু শারীরিক বা মানসিক নয়—আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের অপব্যবহার এবং সঙ্গীর ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করাও সমানভাবে গুরুতর অপরাধ।"
মামলায় আরও উঠে আসে, স্বামী একাধিকবার ভুয়া হলফনামা জমা দিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। ফলে আদালত তাঁর আবেদন খারিজ করে এবং এই ধরনের “ভেক্সেশাস লিটিগেশন” বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দেয়।
ছয় সপ্তাহের মধ্যে ক্ষতিপূরণ বাবদ মামলাকারী স্বামীকে ১৫ লক্ষ টাকা জরিমানার নির্দেশ দেয় আদালত৷ এই টাকা না দিলে ইটাহারের ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মামলাকারী স্বামীর জমি অধিগ্রহণ করবে৷
হিন্দু বিবাহ রীতির ২১ এর বি ধারা অনুযায়ী আদালত বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতি দিয়েছেন।
আদালত জানায়, বিবাহ একটি পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্বের সম্পর্ক। এখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে আর্থিকভাবে শোষণ করতে পারে না। এই রায় শুধু ওই নির্দিষ্ট মামলার জন্য নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবেও দেখা হচ্ছে।















