আজকাল ওয়েবডেস্ক: দেশের রাজধানী দিল্লিতে এই মরসুমের প্রথম তাপপ্রবাহের আগমন ঘটেছে। সেখানকার তাপমাত্রা ৪৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। মৌসম ভবন (আইএমডি) উত্তরের সমভূমি জুড়ে হলুদ সতর্কতা জারি করেছে। ওড়িশার ঝাড়সুগুড়ায় তাপমাত্রা ৪৪.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পৌঁছেছে। তাপমাত্রা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন একটি নীরব আর্থিক সঙ্কটও দানা বাঁধছে। শারীরিক অস্বস্তির বাইরেও, বর্তমানে উপমহাদেশকে পুড়িয়ে দেওয়া গরম প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের উপর আক্ষরিক অর্থেই একটি বিশেষ ‘তাপ কর’ চাপিয়ে দিচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে এসির খরচ, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকাল প্রমাণ করছে যে সূর্য সাধারণ ভারতীয় পরিবারের গড় মাসিক বাজেটকে গলিয়ে দিচ্ছে।
পকেটের উপর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং তীব্র আঘাতটি আসে বিদ্যুৎ বিল থেকে। যেহেতু পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে, তাই এয়ার কন্ডিশনিং ইউনিটগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চলতে বাধ্য হয়।
তবে, ‘এসি প্যারাডক্স’ অনুযায়ী, বাইরের বাতাস যত গরম হতে থাকে, তাপ বের করে দেওয়ার জন্য ইউনিটের কনডেন্সারকে তত বেশি পরিশ্রম করতে হয়, যা এর কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর অর্থ হল, মার্চ মাসে যে ঠান্ডা পাওয়া যেত, এখন সেই একই ঠান্ডা পেতে যন্ত্রটি অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। বেশিরভাগ শহুরে পরিবারের জন্য, এর ফলে মাসিক বিদ্যুৎ খরচে ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেড়ে যায়।
প্রচণ্ড গরম খাদ্য মূল্যস্ফীতির একটি প্রধান কারণ, বিশেষ করে পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে। এপ্রিলে গ্রীষ্মের অকাল আগমন আমের ফুল ফোটাতে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এবং উত্তর ও মধ্য ভারত জুড়ে শাকসব্জি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পচন রোধ করতে কৃষক এবং পরিবেশকরা সেচ এবং হিমায়িত সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বেশি বিনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যার খরচ সরাসরি উপভোক্তার উপর চাপানো হচ্ছে।
উপরন্তু, ৪৪° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পেঁয়াজ এবং টমেটোর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহনকালীন ক্ষতি বেশি হয়, যার ফলে দোকানে কৃত্রিম ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলে গৃহস্থালীর দৈনিক খরচ ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
সম্ভবত সবচেয়ে উপেক্ষিত ব্যয় হল মানব পুঁজি এবং উপার্জন ক্ষমতার উপর এর প্রভাব। গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে মানুষের কার্যকারিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তীব্রভাবে হ্রাস পায়। গরমের কারণে রাতে ঠিক মতো ঘুম না হওয়ায় শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, সঠিক বিশ্রাম হয় না। এর ফলে চিকিৎসাজনিত কারণে ছুটি বেড়ে যায়। রান্নাঘরের গরম এড়াতে খাবার অর্ডার করার মতো ব্যয়বহুল সুবিধাজনক পরিষেবাগুলোর উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। যার ফলে মাসিক বাজেট আরও বেড়ে যায়।
তাপের প্রভাব দৈনন্দিন জীবনের যন্ত্রপাতির উপরও পড়ে। প্রবল গরমের কারণে টায়ার দ্রুত ক্ষয় হয় এবং কুলিং ফ্যান অবিরাম চলতে থাকায় গাড়ির ব্যাটারি অকেজো হয়ে পড়ে। বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) মালিকদের জন্য, তাপ ব্যাটারির চার্জের সীমা কমিয়ে দেয়, যার ফলে আরও ঘন ঘন এবং ব্যয়বহুল চার্জিংয়ের প্রয়োজন হয়। এছাড়াও, ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাবের কারণে শহরের রাস্তাগুলিতে সরকারি তাপমাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলিসিয়াস বেশি গরম অনুভূত হয়। যার ফলে সাধারণ মানুষ গণপরিবহন ছেড়ে ব্যয়বহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিষেবা বেছে নিতে বাধ্য হন। এর ফলেও খরচ বেড়ে যায়।















