আজকাল ওয়েবডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ধীরে ধীরে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার চেহারা বদলে দিচ্ছে। এবার সেই পরিবর্তনের এক শক্তিশালী প্রমাণ মিলল হৃদ্‌রোগ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা-পত্রিকা দ্য ল্যানসেট-এ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বৃহৎ ক্লিনিক্যাল গবেষণায় জানানো হয়েছে, এআই-চালিত নতুন প্রজন্মের স্টেথোস্কোপ প্রাথমিক স্তরেই হৃদ্‌রোগ ধরতে চিকিৎসকদের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

স্পেনের গবেষকদের নেতৃত্বে হওয়া এই সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে ব্যবহারের সময় এআই-স্টেথোস্কোপ হৃদ্‌যন্ত্রের গুরুতর সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে বড় ভূমিকা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হার্ট ফেলিওর, অনিয়মিত হৃদ্‌স্পন্দন (অ্যারিদমিয়া) এবং হার্ট ভাল্‌ভের রোগ—যেগুলি সময়মতো ধরা পড়লে চিকিৎসা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া চিকিৎসকেরা জানান, এআই-স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করে তাঁরা প্রায় দ্বিগুণ হারে নতুন হার্ট ফেলিওরের রোগী শনাক্ত করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে অ্যারিদমিয়া শনাক্তের হার প্রায় তিন গুণ বেড়েছে, যা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি। এই ফলাফল প্রমাণ করে, এআই শুধু সহায়ক প্রযুক্তি নয়, বরং প্রাথমিক রোগনির্ণয়ে এক শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এই গবেষণার সংশ্লিষ্ট লেখক, ইউনিভার্সিটি অব সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার অধ্যাপক সার্জিও সিনজা-সানহুরহো বলেন, “প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা আজ প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে—রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সময় ও সংস্থান সীমিত। ঠিক এই জায়গাতেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।” তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন, শুধু নিখুঁত অ্যালগরিদম থাকলেই হবে না, চিকিৎসকদের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে এই প্রযুক্তিকে স্বাভাবিকভাবে যুক্ত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

‘ট্রাইকর্ডার’ (TRICORDER) নামে পরিচিত এই গবেষণাটি জাতীয় স্তরে পরিচালিত প্রথম ক্লাস্টার-র‍্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত এআই প্রয়োগমূলক ট্রায়াল। এতে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর ২০৫টি জেনারেল প্র্যাকটিস অংশ নেয় এবং এর আওতায় ছিল প্রায় ১৫ লক্ষ নথিভুক্ত রোগী। এক বছরের মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার এআই-সহায়তায় হৃদ্‌যন্ত্র পরীক্ষা করা হয়।

এই স্মার্ট স্টেথোস্কোপে একসঙ্গে তিনটি আলাদা অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিয়মিত চেক-আপের সময় হার্ট ফেলিওর, অনিয়মিত হার্টবিট এবং ভাল্‌ভের সমস্যা শনাক্ত করতে পারে। সামগ্রিকভাবে দেখা গেলে, এআই ব্যবহৃত গ্রুপ ও সাধারণ চিকিৎসার গ্রুপের মধ্যে নতুন হার্ট ফেলিওরের মোট সংখ্যায় খুব বড় পার্থক্য ছিল না। কিন্তু যেসব রোগীকে সরাসরি এআই-স্টেথোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে রোগ শনাক্তের হার অনেক বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হয় যে প্রযুক্তিটি কার্যকর, তবে তা ব্যবহার করাটাই আসল শর্ত।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে বাস্তব সমস্যার কথাও। অনেক ক্লিনিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এআই-স্টেথোস্কোপের ব্যবহার কমে যায়। চিকিৎসকেরা জানান, প্রতিদিনের কাজের মধ্যে অতিরিক্ত ধাপ যোগ হওয়া এবং ইলেকট্রনিক হেলথ রেকর্ডের সঙ্গে প্রযুক্তিটির দুর্বল সমন্বয় তাঁদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

সব মিলিয়ে গবেষকদের উপসংহার স্পষ্ট—এআই ফ্রন্টলাইন স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিতে পারে, কিন্তু তার জন্য শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ, ব্যবহারবান্ধব নকশা এবং গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্তরে পরিকল্পিত সমর্থন। তা হলেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিকারের অর্থে রোগীর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে।