আমেরিকা-ইরান সংঘাতের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তার প্রভাব পড়তে পারে ভারতেও। ভবিষ্যতের আর্থিক সঙ্কট এড়াতে দেশবাসীকে খরচ বাঁচানোর বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
পেট্রোল, ডিজেলের সঙ্গে রান্নার তেলের ব্যবহার কমানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাঙালির রান্নাঘরে তেল ছাড়া রান্না যেন ভাবাই যায় না! তাহলে উপায়? বিকল্প হিসেবে কীভাবে রান্না করবেন? পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ আশিস মিত্র।
ওজন কমানো থেকে কোলেস্টেরল বশে রাখা, নিজেকে সুস্থ রাখতে তেল কম খাওয়ার কোনও বিকল্প নেই। যা আজকাল মেনে চলার চেষ্টা করেন স্বাস্থ্যসচেতন মানুষেরা। কিন্তু মাঝেমাঝে আবার লক্ষ্মণরেখা পার হয়ে যায়। হাজার চেষ্টা করেও রান্নায় তেলের ব্যবহার কমাতে হিমশিম খান, এমন মানুষও কম নেই। ডা: আশিস মিত্রের কথায়, "তেল এমনিতেই শরীরের জন্য খারাপ। যত ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, ওবেসিটি বাড়ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ তেল। তাই তেল কম খাওয়াই শ্রেয়।"
ডা: মিত্র বলেন, "তেলের বিকল্প হিসেবে এয়ার ফ্রায়ারে খাবার তৈরি করতে পারেন। সব রান্না অবশ্য এয়ার ফ্রায়ারে করা সম্ভব নয়। আবার গ্রামাঞ্চলে এয়ার ফ্রায়ার ব্যবহারের এত চল নেই। বাঙালিদের ঘরোয়া রান্নাতেও বহুদিন ধরেই কম তেলের নানা উপায় রয়েছে। যেমন পাঁপড় ভাজার বদলে পুড়িয়ে খাওয়া বা বেগুন ভাজার বদলে বেগুন পোড়া। আসলে বাঙালি তথা ভারতীয়দের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে তেল দিলেই রান্না সুস্বাদু হয়। কিন্তু আদপে তা নয়। স্বাদ হয় মশলার জন্য। রান্নার ধরন বদলালেই সমস্যার অনেকটা সমাধান সম্ভব।"
এছাড়া সাবেকি খাবারের বদলে একটু অন্যভাবে রান্না করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। আশিস মিত্রের কথায়, "মুরগির মাংসের বদলে চিকেন স্টু খেতে পারেন। মাছ ডুবো তেলে না ভেজে ফ্রাইং প্যানে রান্না করলে তেল কম লাগে।"
রান্নাঘরে সরষের তেল, এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল- এই দু'ধরনের তেল ও ঘি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন ডা: আশিস মিত্র। তিনি বলেন, "বাঙালিদের মাছ রান্না সরষের তেল সবচেয়ে উপযোগী। তবে মাছ অল্প তেলে এবং কম আঁচে রান্না করলেই পুষ্টিগুণ বজায় থাকে। অন্যদিকে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল বেশ খরচ সাপেক্ষ। বাঙালিদের খাদ্যাভাসে বেশিরভাগ রান্নাই বেশি তাপে করা হয়, সেক্ষেত্রে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েলের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। এই তেল মূলত সেদ্ধ, ঝালমুড়ির মতো মাখার জন্য ব্যবহার করা উচিত। খুব বেশি হলে পোচ,অমলেট, চিলার জাতীয় খাবার রান্নার জন্য ভাল।"
অন্যদিকে চিকিৎসকের মতে, মাঝে মধ্যে লুচি বা পরোটা খেতে হলে তেলের বদলে ঘি ব্যবহার করা তুলনামূলক ভাল। তবে অবশ্যই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বারবার ছাঁকা তেলে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর৷ কথায়, "তেল ও ঘি-এর এই নিয়ম মেনে রান্না করলে স্বাস্থ্য ঠিক থাকবে, তেলের খরচও বাঁচবে।"
কম তেলে রান্নার পদ্ধতি
ভাপে রান্না: ভাপানো খাবার সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। মাছ, সবজি, চিকেন বা পনির ভাপিয়ে রান্না করলে তেলের প্রয়োজন হয় না বললেই চলে। এতে খাবারের পুষ্টিগুণও বজায় থাকে। ভাপা মাছ, ভাপা সবজি বা স্টিম চিকেন সহজেই রোজের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
গ্রিল ও রোস্ট করা খাবার: ডুবো তেলে ভাজার বদলে গ্রিল বা রোস্ট করলে খাবারে আলাদা স্বাদ আসে। চিকেন, মাছ কিংবা সবজি ওভেনে বা এয়ার ফ্রায়ারে গ্রিল করা যেতে পারে। এতে বাইরের অংশ মচমচে হয়, কিন্তু অতিরিক্ত তেল লাগে না।
নন-স্টিক প্যানের ব্যবহার: সাধারণ কড়াইয়ের বদলে নন-স্টিক প্যান ব্যবহার করলে খুব অল্প তেলেই রান্না সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে শুধু ব্রাশ দিয়ে সামান্য তেল মাখালেই রান্না হয়ে যায়। বিশেষ করে ডিম, মাছ বা সবজি রান্নার ক্ষেত্রে এটি কার্যকর।
দই ও মশলার ব্যবহার বাড়ান: মাছ, মাংস বা পনির রান্নার আগে দই, আদা-রসুন ও মশলা মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিলে খাবার নরম হয় এবং রান্নার সময় আলাদা করে বেশি তেল লাগে না। দইয়ের কারণে রান্নার উপকরণ কড়াইতে লেগেও যায় না।
সেদ্ধ ও স্টুর অভ্যাস: মশলাদার ঝোলের বদলে স্টু বা সেদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস করলে তেলের ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়। চিকেন স্টু, ভেজিটেবল স্টু বা হালকা স্যুপ শরীরের জন্যও উপকার।
প্রেশার কুকারে ভরসা: প্রেশার কুকারে রান্না করলে খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং কম তেলে রান্না করা যায়। বিশেষ করে ডাল, মাংস বা সবজি রান্নায় এটি খুব উপযোগী।
তেল কম খাওয়া মানে শুধু খরচ বাঁচানো নয়, বহু রোগ থেকেও দূরে থাকা। রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য বদল আনলেই সুস্থ জীবনযাপন অনেক সহজ হয়ে উঠতে পারে।














