আজকাল ওয়েবডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অতিমাত্রায় ব্যক্তিগতকৃত অ্যালগরিদমের দাপটে ডিজিটাল দুনিয়া দ্রুত রূপ বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কিশোর-কিশোরীদের জীবনে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে অভিভাবকত্বের চিরাচরিত ধারণা। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, অনলাইন জগতে সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপ নজরদারির চেষ্টা এখন আর কার্যকর নয়। বরং প্রয়োজন বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং নিয়মিত আলোচনার ভিত্তিতে নতুন ধরনের অভিভাবকত্ব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ৯৫ শতাংশেরও বেশি কিশোর-কিশোরী একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। সোশ্যাল মিডিয়া, শর্ট ভিডিও অ্যাপ এবং এআই-চালিত নানা টুল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। জার্নাল অব অ্যাডোলেসেন্ট সাইকোলজি-তে প্রকাশিত ২০২৬ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কিশোর বাবা-মায়ের সঙ্গে খোলামেলা ও আতঙ্কহীন পরিবেশে কথা বলতে পারে, তাদের আত্মসম্মান বেশি এবং সামাজিক ভয় তুলনামূলকভাবে কম।
এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা অভিভাবকদের জন্য একটি ভিন্ন পন্থার কথা বলছেন। সন্তানের ফোন ঘাঁটা বা মেসেজ চেক করার বদলে, তাকে অনুরোধ করা যেতে পারে সে যেন নতুন কোনও অ্যাপ, গেম বা এআই টুল কীভাবে কাজ করে তা বাবা-মাকে বুঝিয়ে দেয়। এতে সন্তানের মধ্যে আস্থাবোধ তৈরি হয় এবং অভিভাবকরাও তার ডিজিটাল জগত সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবে ধারণা পান, গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ না করেই।
২০২৬ সালের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হল এআই-নির্ভর অনলাইন সম্পর্ক। এই বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা সামনে এনেছেন ‘সাইবার সংস্কার’-এর ধারণা, যার অর্থ অনলাইনে নৈতিক আচরণ, সহমর্মিতা এবং পরিণত মানসিকতা গড়ে তোলা। কিশোরদের শুধু ভিডিও দেখা বা স্ক্রলিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কোডিং, ডিজাইন বা সৃজনশীল ডিজিটাল কাজে উৎসাহ দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। পাশাপাশি, ‘এআই কম্প্যানিয়ন’ ধরনের অ্যাপ নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেগুলি অনেক সময় আবেগগতভাবে বিভ্রান্তিকর বা বয়স-অনুপযুক্ত হতে পারে।
আজ, ১১ জানুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, শর্ট ভিডিও এবং তাৎক্ষণিক চ্যাটিং অ্যাপ কিশোরদের মনোযোগের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। এর ফল হিসেবে ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত সামাজিক তুলনা এবং মানসিক অস্থিরতা বাড়ছে। এই কারণে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলি বাড়িতে বিশেষ করে শোবার ঘরে স্ক্রিন-ফ্রি পরিবেশ গড়ে তোলার সুপারিশ করছে।
শিশু মনোবিদ ড. এলেনা মার্কহ্যাম মনে করিয়ে দিচ্ছেন, “কোনও সমস্যা হলে বাবা-মাকেই হতে হবে সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়। অতিরিক্ত আতঙ্ক বা সঙ্গে সঙ্গে সব নিষিদ্ধ করে দিলে কিশোররা তাদের অনলাইন জীবন আরও গোপন করে ফেলবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের জটিল ডিজিটাল বাস্তবতায় সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা কোনও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নয়। বরং প্রতিদিনের খোলা কথা, পারস্পরিক সম্মান এবং বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্কই কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত হয়ে উঠছে।
