গোপাল সাহা: সাব-ইন্সপেক্টর থেকে কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (স্পেশাল ব্রাঞ্চ)— এক অসাধারণ উত্থানের গল্প। কিন্তু এই উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে অভিযোগের পাহাড়। কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিনহা বিশ্বাসকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, তোলাবাজি, জমিদখল, পুলিশ বদলি থেকে শুরু করে কয়লা-বালি পাচার চক্রে সহযোগিতা উপঢৌকনের বিনিময়ে। 

২০২০ সালের করোনা অতিমরারি সময় থেকে শুরু 

কালীঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই শান্তনুর তারকা হয়ে উঠতে শুরু করেন। অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে একের পর এক প্রমোশন পান। শেষে ডেপুটি কমিশনার পদে অবসরের পরও দু’বছরের এক্সটেনশন পেয়ে স্পেশাল ব্রাঞ্চের দায়িত্ব (ডিরেক্টর অফ সিকিউরিটি) সামলান। তিনি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর সুরক্ষার দায়িত্বে। জানা গিয়েছে, শান্তনু মমতাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। বিরোধীরা বারবার এই ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। 

'টাকার রাজা’, অভিযোগ পুলিশ সূত্র ও ইডির তদন্ত অনুসারে

প্রোমোটারদের থেকে তোলাবাজির টাকার বড় অংশ নাকি তাঁর কাছে আসত। সেক্টর ফাইভের কল সেন্টারগুলোর অবৈধ কার্যকলাপের টাকার ভাগও পেতেন তিনি। পুলিশ অফিসারদের বদলি-প্রমোশনের জন্য নাকি মোটা টাকা নিতেন। আইপিএস, ডব্লিউবিপিএস— কেউই বাদ যাননি। তিনি পুলিশ ওয়েলফেয়ার বোর্ডের আহ্বায়ক হওয়ায় সারা রাজ্যের থানার ওসিদের নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ। পুলিশ সূত্রে খবর, বদলির বা ট্রান্সফারের অর্ডার হয়ে গেলেও শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের অনুমতি না থাকলে বা তাঁর কাছে তাঁর যোগ্য উপঢৌকন না পৌঁছলে সেই বদলির অর্ডার পর্যন্ত খারিজ হয়ে যেত কিংবা স্থগিত হয়ে যেত। 
 
জমি দখলের সিন্ডিকেট

ইডির অভিযোগ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। শান্তনু, জয় কামদার ও সোনা পাপ্পুর একটি ত্রিমুখী সিন্ডিকেট চলত বলে জানা গিয়েছে। জয়ের দল টাকা জোগাড় করত। সোনা পাপ্পুর লোকেরা নিরীহ জমির মালিকদের ভয় দেখাত ও হেনস্থা করত। পুলিশের কিছু অংশ দুষ্কৃতিদের ছাতার মতো আগলে রাখত। থানায় ডেকে জমির মালিকদের ভয় দেখানো, জাল চুক্তি, কম দামে জমি দখল— সবকিছুতেই নাকি পুলিশের একটা অংশের সহযোগিতা ছিল। বাড়ি তৈরির নির্মাণ সামগ্রী সিন্ডিকেট ও তৃণমূল কাউন্সিলরদেরও ভাগ দেওয়া হতো। 

উল্লেখযোগ্য বিষয়, ইডির তদন্তে জয় কান্দার ও সোনা পাপ্পুর বাড়িতে তল্লাশি হলে সেখান থেকে উদ্ধার হয় কম্পিউটার মোবাইল ফোন-সহ একাধিক গ্যাজেট ও ডায়রি। আর সেই ডায়রি ও ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটে কিংবা মোবাইল ফোনে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের নাম পাওয়া যায় বলেই আদালতে জানিয়েছেন ইডির আইনজীবী। কয়লা, বালি ও গরু পাচারেও পুলিশি ক্ষমতা ব্যবহার করে সাহায্য করা এবং মোটা অঙ্কের উপঢৌকন নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। 

একজন পুলিশকর্তার পতন

যাঁর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার রক্ষক হওয়ার কথা, তিনিই নাকি অপরাধীদের ছাতা হয়ে উঠেছিলেন বলে অভিযোগ। মমতা সরকারের আমলে ক্ষমতার অপব্যবহারের এক চাঞ্চল্যকর ও আতঙ্কের অধ্যায় হয়ে উঠেছে শান্তনু সিনহা বিশ্বাসের কর্মজীবন। 

ইডির গ্রেপ্তারের পর এখন প্রশ্ন উঠছে— এই সিন্ডিকেটের উপরের স্তরে আর কারা রয়েছেন? চলছে তদন্ত।