আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিউ গিনির ঘন রেইনফরেস্টে বাস করে এমন এক পাখি, যা প্রাণীজগতের নিয়মই যেন পাল্টে দিয়েছে। নাম হুডেড পিটোহুই, বিশ্বের একমাত্র পরিচিত বিষধর পাখি। সাধারণভাবে পাখিকে মানুষ নিরীহ বলেই জানে। কিন্তু এই কমলা-কালো রঙের পাখিটির শরীর ও পালকে এমন বিষ রয়েছে, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্র পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে।

এই পাখির পালক ছোঁয়া কিংবা ভুল করে মাংস খেলে মানুষের শরীরে ঝিনঝিনে অনুভূতি, অবশ ভাব, এমনকি হালকা পক্ষাঘাতের মতো স্নায়বিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এর বিষের প্রকৃতি এতটাই শক্তিশালী যে বিজ্ঞানীদের কাছেও এটি দীর্ঘদিন ছিল অজানা।


১৯৮০–র দশকের শেষ দিকে নিউ গিনিতে মাঠপর্যায়ের গবেষণা করতে গিয়ে এই বিস্ময়কর আবিষ্কার করেন মার্কিন বিজ্ঞানী জ্যাক ডামবাখার। স্থানীয় এলাকায় পাখি ধরার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, পাখি ছোঁয়ার পর যদি হাত দিয়ে মুখ বা চোখে স্পর্শ করা হয়, তবে অদ্ভুত জ্বালা, অবশ ভাব ও ঝিনঝিনে অনুভূতি শুরু হচ্ছে।

প্রথমে বিষয়টিকে কাকতালীয় মনে হলেও, পরে তিনি বুঝতে পারেন সমস্যার উৎস পাখিটিই। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৯২ সালে ডামবাখার ও তাঁর গবেষক দল একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানেই প্রথমবার প্রমাণিত হয় হুডেড পিটোহুইয়ের ত্বক ও পালকে রয়েছে ''ব্যাট্রাকোটক্সিন", যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রাকৃতিক বিষ। এটিই ছিল মানুষের জন্য বিষাক্ত পাখির প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত উদাহরণ।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো এই পাখি নিজের শরীরে বিষ তৈরি করে না। বিজ্ঞানীদের মতে, একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা বিষ সংগ্রহ করে, যাকে বলা হয় ''সিকোয়েস্ট্রেশন"। অর্থাৎ, খাবারের মাধ্যমে পাওয়া বিষ শরীরে জমিয়ে রাখে।

গবেষণায় দেখা গেছে, হুডেড পিটোহুই নিয়মিত একধরনের মেলিরিড বিটল বা বিষাক্ত গুবরে পোকা খায়। এই পোকাগুলির শরীরে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাট্রাকোটক্সিন থাকে। পাখিরা এই পোকা খাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে বিষ জমা হয় তাদের ত্বক ও পালকে।

হুডেড পিটোহুইয়ের উজ্জ্বল কালো ও কমলা রঙ কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়। এটি প্রকৃতির এক বিশেষ কৌশল "অ্যাপোসেম্যাটিজম"। এই রঙ শিকারিদের আগাম সতর্কবার্তা দেয় যে পাখিটি বিপজ্জনক এবং খাওয়ার অযোগ্য।

এই কারণেই নিউ গিনির স্থানীয় বাসিন্দারা বহুদিন ধরেই এই পাখি এড়িয়ে চলে। তারা একে অবজ্ঞাসূচকভাবে “রাবিশ বার্ড” বা “অখাদ্য পাখি” বলেও ডাকে।

যদিও হুডেড পিটোহুই বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত পাখি হিসেবে পরিচিত, বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন নিউ গিনির আরও কিছু পাখির শরীরেও অল্প মাত্রায় একই ধরনের বিষ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্লু-ক্যাপড ইফ্রিট (Ifrita kowaldi)। অর্থাৎ, পাখির জগতে রাসায়নিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একেবারে অনন্য নয়, তবে পিটোহুই তার সবচেয়ে চরম উদাহরণ।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু পাখি নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খল বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিউ গিনির এই রহস্যময় পাখি আজও প্রকৃতির এক বিষাক্ত বিস্ময় হয়েই রয়ে গেছে।