আজকাল ওয়েবডেস্ক: ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি। কিন্তু যুদ্ধের আগাম ছবি ইতিমধ্যেই ভেসে উঠছিল মহাকাশ থেকে। উচ্চ রেজোলিউশনের স্যাটেলাইট ছবি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ইন্টারনেটে। ছবিগুলিতে দেখা যায় বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি। বিমানবন্দরের রানওয়েতে যুদ্ধবিমান দাঁড়িয়ে আছে। মরুভূমির এয়ারবেসে পরিবহন বিমান নামছে। ভূমধ্যসাগরে বিমানবাহী রণতরীর ডেকে সারি দিয়ে ফাইটার জেট রাখা আছে। এই ছবিগুলোর বিস্তারিত তথ্য লেখা ছিল ম্যান্ডারিন ভাষায়। প্রতিটি ছবিতে স্পষ্ট চিহ্ন দেওয়া ছিল। কোন বিমান কোন ধরনের। কোথায় মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কোথায় সেনা জমায়েত। সবকিছু নির্দিষ্ট জিওলোকেশন-সহ দেখানো হয়েছিল। এই ছবিগুলি প্রকাশ করেছিল চীনের একটি ছোট প্রযুক্তি সংস্থা। নাম মিজার ভিশন। ছবিগুলি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই পশ্চিম এশিয়ায় শুরু হয় যুদ্ধ। 

ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখ। আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। এই অভিযানে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালানো হয়। তারপরই পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান। মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে বিভিন্ন আমেরিকান ঘাঁটিতে আঘাত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধের পাশাপাশি আরও একটি ঘটনা চলছিল নীরবে। মহাকাশ থেকে আমেরিকান সামরিক শক্তির গতিবিধি নিয়মিত প্রকাশ পাচ্ছিল। এবং সেই তথ্য আসছিল একই সংস্থা থেকে, মিজার ভিশন। 

প্রথম ডেটা প্রকাশ পায় ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় ইজরায়লের ওভদা এয়ারবেসের রানওয়েতে কয়েকটি এফ-২২ দাঁড়িয়ে আছে। এখানে আমেরিকা এফ-২২ স্টেলথ ফাইটার মোতায়েন করেছিল। দাবি করা হয় মোট ১১টি বিমান ছিল। এর মধ্যে সাতটি পার্কিং এলাকায়। চারটি রানওয়েতে, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। প্রকাশ পায় কাতারের আল-উদেইদ এয়ারবেসের ছবিও। এই ঘাঁটি পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক কেন্দ্রগুলির একটি। স্যাটেলাইট ছবিতে এখানে বিমান, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সেনা উপস্থিতি স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল। পরে ইরানের মিসাইল হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল এই ঘাঁটি। পরবর্তী ডেটাসেটে জর্ডান, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই দেশগুলোর আমেরিকান ঘাঁটির ছবিও প্রকাশিত হয়। সেখানে বিমান মোতায়েন, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। এই সব তথ্য সামাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এক্স হ্যান্ডেলে এবং চিনের উইবো প্ল্যাটফর্মে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এই ছবিগুলি। 

নজরদারি শুধু বিমানঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমুদ্রের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায় আমেরিকার বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে। জাহাজটি ক্রিটের সৌদা বে ঘাঁটি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। জাহাজের ডেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সতর্কতা বিমানও। এছাড়া ফ্লাইট ট্র্যাকিং ডেটাও ব্যবহার করা হয়েছিল। এই তথ্যের সাহায্যে একটি নজরদারি বিমানকে ট্র্যাক করা হয়। বিমানটি বাহরাইনের ঘাঁটি থেকে উড়ে যায়। তারপর আরব সাগরের একটি এলাকায় যায়। 

China's Eyes In Space Exposed US War Machine Before 1st Bomb Fell In Iran War

মিজার ভিশন সরাসরি স্যাটেলাইট পরিচালনা করে না। তাদের কাজ মূলত তথ্য বিশ্লেষণ করা। এই সংস্থাকে অনেক বিশ্লেষক ‘ইন্টেলিজেন্সের ব্লুমবার্গ’ বলে থাকেন। কারণ তারা বিভিন্ন উৎসের তথ্য একত্র করে। তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করে। তাদের ব্যবহৃত ডেটার উৎস কয়েক ধরনের। বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি, এডিএস-বি বিমান ট্র্যাকিং সিগন্যাল এবং এআইএস জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটা একত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। এই ছবিগুলি কোথা থেকে এসেছে তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে দু’টি সম্ভাব্য উৎসের কথা বলা হচ্ছে। জিলিন-১ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক, এবং পরের উৎসটি পশ্চিমি বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট কোম্পানি। ইরান এই তথ্য ব্যাবহার করে আমেরিকার ঘাঁটিগুলকে আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে নির্বাচন করেছিল কিনা, তা নিশ্চিত ভাবে জানা যায় না। তবে একটি বিষয় লক্ষ্য করা গিয়েছে। মিজার ভিশন যে কয়েকটি ঘাঁটির ছবি প্রকাশ করেছিল, পরবর্তীতে সেগুলির কয়েকটিতে আক্রমণ হয়েছিল। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য কাতারের আল-উদেইদ এয়ারবেস। 

এই ঘটনা আধুনিক যুদ্ধের একটি নতুন ধরণ বিশ্বের সামনে এনে দিল। মহাকাশ থেকে পাওয়া বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট ছবি এখন শুধু রাষ্ট্রের হাতে নেই। ছোট বেসরকারি সংস্থাও সেই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে দিয়েছে। ফলে যুদ্ধের তথ্য প্রায় বাস্তব সময়েই প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সামরিক গোপনীয়তা রক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু মাটিতে বা আকাশে হবে না। তার বড় একটি অংশ চলবে মহাকাশের নজরদারির ভিতরেও। 

যুদ্ধ আকাশ ছাড়িয়ে এবার ছোঁবে মহাকাশ।