আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদ সর্বসম্মতভাবে ‘অ্যামনেস্টি আইন’ (ক্ষমা আইন) অনুমোদন করেছে। আইনটি পাসের সময় পুরো আইনসভা এর পক্ষে ভোট দেয়—যা দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ আইনটিতে স্বাক্ষর করে বলেন, “আমাদের জানতে হবে কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয়, এবং কীভাবে ক্ষমা গ্রহণ করতে হয়। এই অ্যামনেস্টি আইন সেই প্রক্রিয়ার দরজা খুলেছে।” জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্জে রড্রিগেজ—যিনি প্রেসিডেন্টের ভাই—বলেন, “এমন দুর্ভাগ্যজনক ও বিপর্যয়কর ঘটনা ঘটতে হয়েছে বলেই আজ আমরা সবাই ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও শান্তির কথা বলছি।”

জাতীয় পরিষদের বিশেষ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে কয়েকশো মানুষ মুক্তি পেয়েছেন। কমিশনের সদস্য ও কংগ্রেসম্যান হোর্জে আরিয়াজা জানান, প্রায় ৪,২৯৩টি ক্ষমার আবেদন জমা পড়েছে। যাঁরা আগে প্যারোলে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩,০০০ জন এখন সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছেন।

আইনের দ্বিতীয় দফা আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিরা কি আদালতে আইনি প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন? আইন অনুযায়ী, আবেদন জমা দেওয়ার পর রাষ্ট্র আবেদনকারীকে আটক করবে না। তবে চূড়ান্তভাবে ক্ষমা পেতে হলে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে ভেনেজুয়েলায় সরাসরি উপস্থিত হতে হবে। এছাড়া, আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—যাঁরা সংশ্লিষ্ট অপরাধমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করেছেন বা বন্ধ করবেন, কেবল তাঁদের ক্ষেত্রেই এই আইন প্রযোজ্য হবে।

আইনটি ২০০২ সালের এপ্রিল মাসের অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় সংঘটিত কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেই সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি উগো শাভেজ-এর বিরুদ্ধে সামরিক ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর বা হামলার মতো ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এই আইনের আওতায় আসতে পারেন। এছাড়া, বিক্ষোভের সময় সংঘটিত কিছু অপরাধ এবং সে-সম্পর্কিত মামলায় চাকরি হারানো সরকারি কর্মচারীরাও পুনর্বহালের সুযোগ পাবেন।

&t=21s

তবে আইনটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, খুন, মাদক পাচার বা দুর্নীতির মতো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—যাঁরা “দেশের জনগণ, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ, শক্তিপ্রয়োগ বা বিদেশি আগ্রাসনের আহ্বান, উস্কানি, সহায়তা বা অর্থ সাহায্য  করেছেন”, তাঁদের কোনওভাবেই ক্ষমা করা হবে না। অবৈধ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সমর্থনকারীদের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য।

এই আইনের ঘোষণার পর অনেক ভুক্তভোগী পরিবার তাঁদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইনেস এসপাররাগোজা—যাঁর ছেলে অর্ল্যান্ডো ফিগুয়েরাকে সরকারপন্থী পরিচয়ের অভিযোগে ছুরিকাঘাত করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের সামনে বলেন, “আমরা চাই দোষীদের শাস্তি হোক।” আইনটি এই ধরনের নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও ক্ষমার বিধান রাখেনি—যা অনেকের কাছে আশ্বস্তকর।

অ্যামনেস্টি আইনটি এসেছে এক অস্থির সময়ে। মার্কিন সামরিক অভিযানে প্রায় ১০০ জনের মৃত্যু এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেপ্তারের পর দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়। বর্তমানে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে আটক রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁদের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে।

এদিকে ট্রাম্প  প্রশাসন জানিয়েছে, তারা রড্রিগেজ সরকারের সঙ্গে কিছু সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছে—জ্বালানি সংস্কার, বিশেষ করে তেল রফতানি নীতিতে পরিবর্তন না এলে দ্বিতীয় দফা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। প্রস্তাবিত সংস্কার অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কাছে তেল বিক্রি করতে পারবে, কিন্তু কিউবা ও অন্যান্য নির্দিষ্ট দেশে রফতানি করতে পারবে না।


ভেনেজুয়েলার উপর দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে, যার ফলে দেশটির অর্থনীতি বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখন প্রশ্ন—এই অ্যামনেস্টি আইন এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সংস্কার কি ওয়াশিংটনের মনোভাব নরম করবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আইন একদিকে জাতীয় পুনর্মিলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির জটিল সমীকরণও স্পষ্ট করছে। শান্তি ও পুনর্গঠনের এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যেতে পারবে কি না, সেটাই এখন দেখার।