আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরানে বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার নিয়েছে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত, যখন নির্বাসিত প্রাক্তন যুবরাজ রেজা পাহলভি নাগরিকদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানান। সরকারের জারি করা সারা দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন পরিষেবা বন্ধের নির্দেশ অগ্রাহ্য করেই বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ঠিক আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সংক্ষিপ্ত ভিডিও ফুটেজে তেহরানসহ একাধিক শহরে অগ্নি সংযোগকে ঘিরে সরকার বিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ ও আগুন, সংঘর্ষের ইঙ্গিত দেয়। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিক্ষোভ কতটা ছড়িয়ে পড়েছে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার প্রথমবারের মতো ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম অশান্তির কথা স্বীকার করে নেয়। তবে তারা অভিযোগ করে, এই হিংসা ও অগ্নিসংযোগের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-ঘনিষ্ঠ “সন্ত্রাসবাদী এজেন্ট”। কয়েকজনের হতাহতের কথা বলা হলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
এর মধ্যেই টেলিভিশনে দেওয়া সংক্ষিপ্ত ভাষণে ৮৬ বছর বয়সি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। শ্রোতাদের “আমেরিকার মৃত্যু হোক” স্লোগানের মধ্যে তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা বিদেশি নেতাদের সন্তুষ্ট করতে নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে খামেনেই বলেন, “অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে খুশি করতেই তারা এমন করছে।”
ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ প্রথমে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনের জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলির সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। টাকার ভয়াবহ পতন, কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের অভিঘাত জনঅসন্তোষ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই আন্দোলন রেজা পাহলভির রাজনৈতিক প্রভাব যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহের পুত্র পাহলভি বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় এবং আবার শুক্রবার ইরানিদের বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানান। কিছু বিক্ষোভে রাজতন্ত্রের পক্ষে স্লোগানও শোনা গেছে, যা এক সময় মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত বিক্ষোভ-সংক্রান্ত হিংসায় অন্তত ৪২ জন নিহত এবং ২,২৭০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এই সংখ্যাগুলি নিশ্চিত করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের ছবি ও তথ্য বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছানো ঠেকানো। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হলি ড্যাগ্রেস বলেন, “এই কারণেই ইন্টারনেট বন্ধ যাতে বিশ্ব এই বিক্ষোভ দেখতে না পারে।” তাঁর সতর্কবার্তা, এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা বাহিনী আরও নির্বিঘ্নে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে।
পাহলভি সরকারের বিরুদ্ধে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভিন্নমত দমন করার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি ইউরোপীয় নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একজোট হয়ে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ইন্টারনেট পরিষেবা পুনরুদ্ধারের দাবি তোলেন, যাতে “ইরানিদের কণ্ঠস্বর ও ইচ্ছা” বিশ্ব শুনতে পারে।
ওয়াশিংটন থেকেও কড়া বার্তা এসেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে এবং তেহরানকে “চরম মূল্য দিতে হবে।” তবে তিনি পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ বা তাঁকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে প্রকাশ্যে সমর্থন করার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
বিদেশি হুমকি ও চাপ সত্ত্বেও ইরানের নেতৃত্ব এখনও অনড়। কিন্তু বিক্ষোভের বিস্তার, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বাড়তে থাকা জনরোষ সব মিলিয়ে রাষ্ট্র ও তার সমালোচকদের সংঘাত আগামী দিনে আরও তীব্র আকার নেবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
