আজকাল ওয়েবডেস্ক: ইরান ও ওমানের মাঝখানে একটি সরু সমুদ্রপথ। পার্শিয়ান গালফকে গালফ অফ ওমান ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে এই সরু সমুদ্রপথ। এই হল, হরমুজ প্রণালী। বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের একটি হল এই হরমুজ প্রণালী। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের একটা বিশাল অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছায়। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চে এমন এক ঘটনা ঘটেছে যা দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক বিশ্বে সবসময় যুদ্ধজাহাজ বা মিসাইল নয়, কখনও কখনও বীমা সংস্থার একটি ফোন কলও সমুদ্রপথ বন্ধ করে দিতে পারে। একাধিক সূত্রের তথ্য তেমনটাই।
৩ মার্চের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে কার্যত কোনও তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছিল না, তার কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ঘটমান যুদ্ধ নয়। বরং বীমা সংস্থার সেই ফোন কল।
ঘটনার সূত্র খুঁজতে গেলে বেশ কয়েক শতক পিছনে যেতে হয়। সালটা ১৬৮৮। তথ্য, এডওয়ার্ড লিয়র্ড টাওয়ার স্ট্রিটে একটা কফি হাউজ চালাতেন। সেখানে যেতেন, জাহাজের ক্যাপ্টেন, ব্যাবসায়ীরা। নিজেদের মধ্যে সমুদ্র পথ নিয়ে নানান আলোচনা করতেন। কোন দিকের সমুদ্র কেমন, সমুদ্রের কোন দিকে জাহাজ গিয়েছে কিন্তু ফিরে আসেনি, ইত্যাদি নানান সামুদ্রিক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা চলত।
এই ঝুঁকিপূর্ণ দিকে, যে ক্যাপ্টেন বা ব্যাবসায়ী যেতেন, বা সেই দিকের দায়ভার নিতেন, তাঁরা যে জাহাজ নিয়ে যাচ্ছেন, সেই জাহাজের বিবরণের নিচে নিজেদের নাম লিখে রাখতেন। সেই থেকেই আন্ডার টেকার শব্দটি এসেছে। সমুদ্রপথের এই ঝুঁকির অংশীদার হওয়া থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়, বিশ্বের সমুদ্রবাণিজ্যকে ঘিরে বীমা কাঠামো।
সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের এক প্রতিবেদন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য, ইন্টার্ন্যাশনাল গ্রুপ অফ পি অ্যান্ড আই ক্লাবস, বিশ্বে ৯০% সমুদ্রগামী জাহাজের বীমা কভার করে। কিন্তু, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ যখন অপারেশন এপিক ফিউরি নামে সামরিক অভিযান শুরু হয়, তখন যুদ্ধকালীন ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে এই ১২ টি বীমা সংস্থা একসঙ্গে সমস্ত কভারেজ বাতিল করে। এর ফলে সমগ্র সমুদ্রকেন্দ্রিক বাণিজ্য ব্যাবস্থা থমকে যায়।
এই সংস্থাগুলি সমস্ত রকমের ক্ষয় ক্ষতিই কভার করে থাকে। মানুষের প্রাণহানি, কার্গোর ক্ষয়ক্ষতি, জাহাজের কোনও কর্মী বা সদস্য কোনওরকমভাবে আহত হলে, বা প্রাকৃতিক কোনও বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সবটাই কভার করে থাকে।
বীমা ছাড়া জাহাজ বন্দরে ঢুকতে পারে না। তাই বীমা কভারেজ বাতিল হলে জাহাজ সমুদ্রে পাড়ি দেবে না। তাছাড়া সমস্যা হয় ব্যাঙ্কেও। বীমা ছাড়া কোনও ব্যাঙ্ক অর্থ সাহায্য করে না। এর পাশাপাশি বাতিল হয় চার্টার, এবং কার্গো নামানো যায় না। ফলে প্রায় ১৫০টি জাহাজ উপসাগরের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে।
২১ মাইল প্রশস্ত এই হরমুজ প্রণালী পৃথিবীর জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। প্রতিদিন এখান দিয়ে যায়, অন্তত ২ কোটি ব্যারেল ভর্তি তেল। এছাড়া বিশ্বে প্রায় ২০% লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) বা প্রাকৃতি গ্যাস এখান দিয়ে যায়।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতে বীমার দাম ছোঁয় আকাশ। এমনিতে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ধার্য্য অর্থের পরিমাণ জাহাজের মূল্যের ০.২৫%। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সেই অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১%, যা প্রতি যাত্রায় প্রায় ১০ লক্ষ ডলার বা ভারতের অঙ্কের প্রায় ৯.২ কোটি রুপি। এই বীমা পুরোপুরি বাতিল হওয়ায় ইউরোপে গ্যাসের দাম বেড়ে যায় প্রায় ৫০% এবং এশিয়ায় এলএনজি বাড়ে ৩৯%।
সমুদ্রবীমার এই জটিল কাঠামো আসলে তিনটে স্তরে ভাগ থাকে। পি অ্যান্ড আই ক্লাব, বা প্রাথমিক স্তর। রিইনশিওরেন্স, এবং শেষের স্তরটি রেট্রোসেশন। এই শেষের স্তরটিই ২০২৬ এসে আর ঝুঁকি নিতে চাইনি। ফলে, এই সমুদ্রের ঝুঁকিকে ঘিরে তৈরি হওয়া গোটা বাজারই তার অস্তিত্ব হারায়।
তথ্য, ৮০-এর দশকে ট্যাঙ্ক যুদ্ধ চলাকালীন প্রায় ৫০০টি জাহাজ সেই যুদ্ধে আক্রান্ত হয়। তারপরেও বাণিজ্য বন্ধ হয়নি। কারণ মাথার উপর থেকে বীমা সংস্থাগুলি হাত সরিয়ে নেয়নি।
তবে শুধু এই একটিমাত্র কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়েছে এমনটা নয়। আরেকটি বড় কারণ ছিল শ্রমিক সংগঠনের সিদ্ধান্ত। ইন্টার্ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কারস ফেডারেশন এবং জয়েন্ট নেগোশিয়েটিং গ্রুপ, এই হরমুজ প্রণালীকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র বলে ঘোষণা করে। এর ফলে, নাবিকরা অতিরিক্ত বেতনের সঙ্গে পায় মৃত্যুকালীন বা আঘাতের জেরে হওয়া ক্ষতির, দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ। পাশাপাশি তারা যাত্রা না করলে চাইলে, সেই যাত্রা অস্বীকার করার অধিকারও পায়।
এই পরিস্থিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, আমেরিকার ইউনাইটেড স্টেটস ইন্টার্ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফন্যান্স কর্পোরেশন থেকে উপসাগরীয় বাণিজ্যের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকির বীমা দেওয়া হবে বলে। এর সঙ্গে আমেরিকার নৌবাহিনীর এসকর্ট দেওয়ার কথাও বলা হয়।
ভারতীয় জাহাজ মালিকরা পশ্চিমা বীমা সংস্থার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। কারণ, ভারত বিশের তৃতীয় বৃহত্তম তেম আমদানিকারক। কিন্তু ১২ টি আন্তর্জাতিক পিঅ্যান্ডআই ক্লাবগুলোর মধ্যে ভারত নেই। ফলে ভারতীয় জাহাজ মালিকদের পশ্চিমা বীমা সংস্থার সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া উপায় নেই।
১৯শ শতকের চিন্তাবিদ হুগো গ্রটিয়াস তাঁর বই মের লিবেরামে বলেন সমুদ্র সমস্ত দেশের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিৎ। কিন্তু আজকের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। শুধু যুদ্ধ নয়, বাণিজ্যকে লন্ডভন্ড করতে বীমা সংস্থার একটি মাত্র ফোনই যথেষ্ট।
