আজকাল ওয়েবডেস্ক: একসময় পাকিস্তান ভারতের চেয়েও ধনী ছিল। কোনও হাসির কথার কথা নয়,  এটি আইএমএফ-এর তথ্য এই কথা বলছে। ২০০০ সালে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৭৩৩ ডলার। ভারতের ছিল ৪৪২ ডলার। বাংলাদেশের নামমাত্র। নেপাল ছিল আরও গরিব। পাকিস্তান অর্থনৈতিক গতি নিয়ে নতুন শতাব্দীতে প্রবেশ করেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন দেশটি সাফল্যের পথে এগোচ্ছে। এরপর যা ঘটল, তা আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে অন্যতম আত্মঘাতী অর্থনৈতিক বিপর্যয়।

আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি সামান্য বেড়ে ১,৫৭৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২,৭১১ ডলার। যা শুধু এক দশকেই ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি। আইএমএফ-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, একই সময়ে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি ২০১৪ সালের ১,৪২৪ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১,৫৮১ ডলারে পৌঁছেছে। ইসলামাবাদের জন্য সম্ভবত ভাবনার বিষয় ছিল বাংলাদেশ। যে দেশটি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে এক দীর্ঘ যুদ্ধের পর জন্ম নিয়েছিল, বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, নানা ঝঞ্ঝা কাটিয়ে সেই দেশের মাথাপিছু জিডিপি ছিল ২,৫৯৩ ডলার।

মাথাপিছু জিডিপির নিরিখে পাকিস্তান আজ দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি অর্থনীতির মধ্যে সপ্তম স্থানে রয়েছে। ভারতের পিছনে। বাংলাদেশের পিছনে। নেপালের পিছনে। একেবারে শেষ স্থানে আফগানিস্তান ছাড়া আর কারও আগে নয়।

২০২৩ সালে, বিনিময় হারের ভিত্তিতে ভারতের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে ১.৮৬ গুণ বেশি ছিল, যা ছিল সর্বকালের সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাঙ্কের ওপেন ডেটা অনুসারে, ২০০৮ সালই ছিল শেষ বছর যখন পাকিস্তান ভারতের চেয়ে ধনী ছিল। এই ঘটনার পর ইসলামাবাদ নিজেই নিজের জন্য এক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।

বিশ্বব্যাঙ্কের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারতের মাথাপিছু আয় দাঁড়ায়  ২,৬৯৪.৭ ডলারে, যেখানে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ১,৪৭৮.৮ ডলারে। এই ব্যবধান প্রতি বছরই বাড়ছিল।

যে দেশ হিসাবে নেপালকে হারাতে হিমশিম খাচ্ছিল, সেই পাকিস্তানই ২০০৮ সালে মুম্বইয়ে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসী পাঠিয়েছিল। পাকিস্তানে অবস্থিত লস্কর-ই-তইবা নেটওয়ার্ক আটজন সন্ত্রাসীকে বছরের পর বছর ধরে লালন-পালন করেছিল এবং উন্মত্ত হত্যাকাণ্ডের জন্য দশজনকে মুম্বইয়ে পাঠিয়েছিল।

হাসপাতালগুলিতে ওষুধের ঘাটতি এবং অর্থনীতি নিম্নমুখী, এই পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ এমন এক প্রতিবেশীর কাছে সন্ত্রাস রপ্তানি করতে ব্যস্ত ছিল, যাকে সে অর্থনৈতিকভাবে আর ছাড়িয়ে যেতে পারছিল না। অবশেষে যখন সন্ত্রাস প্রশমিত হলো, তখন ছয়জন আমেরিকানসহ ১৬৬ জন নিহত হয়েছিলেন।

১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত আইএমএফ-এর কাছ থেকে ২৪ বার  আর্থিক সাহায্য পেয়েছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সর্বশেষটি হল ৭ বিলিয়ন ডলারের এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি, যার অধীনে আইএমএফ ২০২৫ সালের মে মাসে ১ বিলিয়ন ডলারের একটি কিস্তি অনুমোদন করেছে। যদিও সেই টাকা আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসে ব্যয় করার অভিযোগ তুলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটদান থেকে বিরত ছিল।

আইএমএফ থেকে ২৪ বার আর্থিক সাহায্য কোনও ভাবেই পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নয় — এটা এক ধরনের নির্ভরশীলতা। আর এই টাকা দিয়ে পাকিস্তান কী গড়েছে? ইউএনডিপি-র ২০২৩-২৪ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৪টি দেশের মধ্যে ১৬৪তম অবস্থানে থাকা একটি দেশ। ভারতের পিছনে। বাংলাদেশের পিছনে। শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল এবং মলদ্বীপের পিছনে। আফগানিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে শেষ অবস্থানে। 

পাকিস্তান ক্লাসরুমের পরিবর্তে বোমা বেছে নিয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে প্রক্সি যুদ্ধ বেছে নিয়েছে। উন্নত হওয়ার পরিবর্তে ভয়ের কারণ হতে চেয়েছে। ইউএনডিপি-র পরিসংখ্যান কোনও অভিযোগ নয় — এগুলি গত পঞ্চাশ বছরের সিদ্ধান্তের ফল। দেশের অর্ধেক মানুষ দরিদ্র, অশিক্ষিত ও বেকার। সেনাবাহিনী পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত। সামরিক কর্মকর্তাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়াশোনা করছে, অথচ পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করছে। 

পাকিস্তানের পতন কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। রাষ্ট্রই এটি বেছে নিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে সামরিক বাহিনী এই হিসাব কষেছে যে, স্কুল, কর আদায়কারী এবং কার্যকর আদালতের চেয়ে প্রক্সি সন্ত্রাসবাদ ও পারমাণবিক প্রতিরোধ বেশি মূল্যবান। অবশেষে তার মূল্য দিতে হচ্ছে। ২০২৬ সালের পাকিস্তান পরিস্থিতির শিকার নয়। এটি একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের ফল। সেই বাজি ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষ তার মূল্য দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে।