আজকাল ওয়েবডেস্ক: মধ্য এশিয়ার সংঘাতে হঠাৎ যুদ্ধবিরতির পেছনে উঠে এসেছে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা। ইরানের বিদেশমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে “প্রিয় ভাই” বলে উল্লেখ করে তাদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। এই বার্তাটি পরে শেয়ার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যা এই আলোচনায় ইসলামাবাদের ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শরিফও এক পোস্টে ঘোষণা করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের মিত্রদের সঙ্গে “তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি”-তে সম্মত হয়েছে, যা লেবাননসহ সর্বত্র কার্যকর হবে। তিনি ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানান, যেখানে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা হবে।
তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের মাঝেই বিতর্কও তৈরি হয়েছে। শরিফের একটি আগের পোস্টে ভুলবশত ড্রাফট শব্দটি থেকে যাওয়ায় তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে অভিযোগ করেন, হোয়াইট হাউসের বার্তা কপি করা হয়েছে। যদিও পরে পোস্টটি সংশোধন করা হয়, ততক্ষণে স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে যায়।
এই যুদ্ধবিরতির নেপথ্যে ছিল জটিল কূটনৈতিক তৎপরতা। রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স, বিশেষ দূত স্টিভ ইউকঅফ এবং আরাঘচির মধ্যে সারারাত ধরে যোগাযোগ চলেছে, যেখানে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে।
কেন পাকিস্তানের উপর ভরসা করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান?
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের গ্রহণযোগ্যতার পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সীমান্ত ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, ইজরায়েলের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় তেহরানের কাছে ইসলামাবাদ একটি নিরপেক্ষ অংশীদার হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগে অংশগ্রহণ ইসলামাবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি, উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় পাকিস্তান এই জটিল সমীকরণে ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছে।
নিজস্ব স্বার্থেই যুদ্ধবিরতির তাগিদ
পাকিস্তানের এই উদ্যোগের পেছনে শুধু কূটনৈতিক গুরুত্ব নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। দেশটি মধ্য এশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে এবং লক্ষাধিক পাকিস্তানি ওই অঞ্চলে কর্মরত। সংঘাতের কারণে তেলের দাম বৃদ্ধি ও হরমুজ বন্ধ হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছিল।
এছাড়া, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও বাড়ছিল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই-র হত্যার পর পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সাফল্যের সঙ্গে বড় ঝুঁকিও
তবে এই যুদ্ধবিরতি অত্যন্ত নাজুক। আলোচনায় ভাঙন ধরলে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য বড় ধাক্কা খেতে পারে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—যেকোনও পক্ষই ইসলামাবাদকে দোষারোপ করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, পাকিস্তানের কাছে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখার মতো সামরিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতা সীমিত। ফলে সংঘাত আবার শুরু হলে পাকিস্তান কঠিন অবস্থায় পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলেই অভ্যন্তরীণ চাপ, আর ইরানকে সমর্থন করলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতি।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান এই মুহূর্তে কূটনৈতিকভাবে বড় সাফল্য পেলেও সামনে রয়েছে কঠিন পরীক্ষা। আগামী কয়েক দিনের আলোচনা নির্ধারণ করবে—এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে, নাকি নতুন করে অস্থিরতা বাড়াবে।















