আজকাল ওয়েবডেস্ক: নেপালে আগামী ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রতিনিধি সভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও প্রস্তুতি জোরদার করছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কির নেতৃত্বাধীন প্রশাসন লজিস্টিক, নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় দ্রুততর করেছে, যাতে ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

রাজনৈতিক আবহে কিছুটা শিথিলতা

সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, কার্কি দায়িত্ব নেওয়ার পর উত্তেজনা কিছুটা বাড়লেও বর্তমানে প্রধান দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক আবহ শান্ত হয়েছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো এখনো নেতৃত্ব নির্ধারণ ও অভ্যন্তরীণ বৈঠক নিয়েই ব্যস্ত হলেও প্রায় সকলেই নির্বাচনে অংশগ্রহণে সহমত প্রকাশ করেছে। নতুন দলগুলোও প্রার্থী বাছাই ও প্রচার শুরু করেছে। প্রথমদিকে দূরত্ব বজায় রাখা কার্কি ধীরে ধীরে আরও আলোচনামুখী অবস্থান নিয়েছেন।

২৭ নভেম্বর তিনি প্রথমবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর প্রতিনিধি দলের সঙ্গে, যার নেতৃত্বে ছিলেন সাধারণ সম্পাদক শঙ্কর পোখরেল। দলটি আগের সর্বদলীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও এবার আলোচনা ছিল সরাসরি। তবে ইউএমএল–এর চেয়ারম্যান কে.পি. শর্মা ওলি, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির নেতা পুষ্পকমল দাহাল ‘প্রচণ্ড’ বা নেপালি কংগ্রেস নেতা শের বাহাদুর দেউয়াকে এখনো বৈঠকে ডাকা হয়নি।

ওলির ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বড় ইস্যু

ইউএমএল নির্বাচনে নীতিগতভাবে বাধা না দিলেও ওলির বিরুদ্ধে আরোপিত চলাচল নিষেধাজ্ঞাকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছে। তদন্ত কমিশনের সুপারিশে গৃহ মন্ত্রক তাঁর  ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ফলে নির্বাচনী প্রচারের আগেই ওলিকে প্রতিবার কমিশনের অনুমতি নিতে হচ্ছে। ইউএমএল এখনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং তারা সংসদ পুনর্বহালের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে রিট দায়ের করেছে। তবুও দলটি নির্বাচন কমিশনে নাম নথিভুক্ত করেছে—যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার পক্ষে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

বড় দলগুলো অংশ নিচ্ছে, নতুনদের ঢল

নেপালি কংগ্রেস ইতিমধ্যে ভোটে অংশ নেওয়ার  সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। তাদের বক্তব্য, রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে নির্বাচনের বিকল্প নেই। দাহালের নেতৃত্বাধীন নেপালি কমিউনিস্ট পার্টিও ভোটে অংশ নেবে এবং ছোট কমিউনিস্ট দলগুলোকেও সঙ্গে আনছে। বিভক্ত মাওবাদী দলগুলোর কয়েকটি অংশও অংশগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে। সবচেয়ে বড় নতুন বাস্তবতা হলো—জেন জি  প্রজন্মের উত্থান। তরুণদের নেতৃত্বে নতুন দল ও আন্দোলন অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনে ১৩৭টিরও বেশি দল রেজিস্ট্রি করেছে—যার মধ্যে ১০৬টি মার্চের ভোটে অংশ নেবে। ২০২২–এর নির্বাচনে হয়েছিল ৮২টি দল।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি

স্থায়ী প্রধান না থাকলেও নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান রাম প্রসাদ ভান্ডারি জানিয়েছেন—প্রস্তুতি চলছে এবং ভোট পরিচালনায় কমিশন সক্ষম। ভোটার তালিকা হালনাগাদ হয়েছে, যুক্ত হয়েছে ১,০১,৬৭৪ নতুন ভোটার। মোট ভোটার সংখ্যা এখন ১৯ লাখ ৩ হাজার ৩২৪।

নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

৮ ও ৯ সেপ্টেম্বরের হিংসায় পুলিশ নিহত, আহত এবং ১,২০০ অস্ত্র ও ৪০০'র বেশি পুলিশ পোস্ট লুট হওয়ার ঘটনায় নিরাপত্তা উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। তাই সরকার এবার সেনাবাহিনীকে বড় ভূমিকা দিতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পাওডেল ইতিমধ্যেই সেনা মোতায়েন অনুমোদন করেছেন। কার্কি সেনা সদর দপ্তরে গিয়ে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। অস্থায়ী পুলিশ নিয়োগ এবং ভারত-সহ কয়েকটি দেশ থেকে সরঞ্জাম আনার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবুও রাজনৈতিক দলগুলো ভোট আয়োজনের পরিবেশ সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাধীন হওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

দলের অভ্যন্তরীণ সংকট ও সতর্কতা

ইউএমএল ও নেপালি কংগ্রেস উভয়েরই নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন রয়েছে। জেন-জি আন্দোলনের কিছু অংশ আগাম সতর্ক করেছে—তাদের দাবি না মানলে তারা ভোট বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

নির্বাচন পিছলে গেলে সাংবিধানিক সংকট

কার্কির মেয়াদ ছয় মাস এবং তাঁর প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন আয়োজন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে তাঁর সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। সুপ্রিম কোর্টে ইতিমধ্যে সংসদ ভাঙার বিরুদ্ধে একাধিক রিট চলছে। যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া গতি পায়, আদালত সংসদ পুনর্বহাল নাও করতে পারে। কিন্তু নির্বাচন থমকে গেলে পুনর্বহালের সম্ভাবনা বাড়বে।

বহু বাধা—নিরাপত্তা সংকট, রাজনৈতিক বিভক্তি, বিচার বিভাগীয় জটিলতা—সত্ত্বেও নেপাল ধীরে ধীরে নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। এখন আর নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করা সহজ নয়—সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। তাই প্রশ্ন একটাই—এই গতি কি মার্চ ৫ পর্যন্ত ধরে রাখা সম্ভব? উত্তর মিলবে সময়েই—কিন্তু আপাতত নেপাল অপেক্ষা করছে, উত্তরের দিকে তাকিয়ে।